শিল্পীর সংসার ধর্ম সম্বন্ধে ধারণা থাকা প্রয়োজন

বিদুষী গিরিজা দেবী, এই উপমহাদেশের সংগীত জগতের এক প্রবীণ নক্ষত্র। জন্ম ১৯২৯ সালের ৮ মে। তার সংগীতের হাতেখড়ি পাঁচ বছর বয়সে সেনিয়া ঘরানার পণ্ডিত সারজু প্রসাদ মিশ্রের কাছে। পরে খেয়াল ও টপ্পা ছাড়াও সংগীতের অন্যান্য শাখায়ও তালিম নেন শ্রীচাঁদ মিশ্রের কাছ থেকে। আহমেদাবাদের অল ইন্ডিয়া রেডিওর মাধ্যমে ১৯৪৯ সালে প্রথম আত্মপ্রকাশ করেন গিরিজা দেবী। মঞ্চে তাঁর প্রথম একক পরিবেশনা ১৯৫১ সালে, বিহারে। ১৯৬০ সালের প্রথম দিকে গুরু শ্রীচাঁদ মিশ্রের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি তাঁর কাছে তালিম নিয়েছেন। আশির দশকে কলকাতার আইটিসি সংগীত রিসার্চ একাডেমী এবং নব্বইয়ের দশকে বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটিতে গিরিজা দেবী শিক্ষকতা করেন। ২০০৯ থেকে তিনি দেশের বাইরে সংগীত পরিবেশনা শুরু করেন। তাঁর সংগীত শিক্ষা বেনারস ঘরানায় এবং তাঁর কণ্ঠে এই ঘরানায় পূরবী অঙ্গের ঠুমরি শ্রোতাদের মন্ত্রমুগ্ধ করেছে অগণিত বার। রাগাশ্রয়ী কাজরী, চৈতী, হোলী পরিবেশনাতেও গিরিজা দেবী অসংখ্য প্রশংসা কুড়িয়েছেন। তাঁর পরিবেশনায় উচ্চাঙ্গসংগীতের সঙ্গে বিহার ও উত্তর প্রদেশের সংগীতের এক চমৎকার সংমিশ্রণ লক্ষ্য করার মতো। ১৯৭২ সালে ভারত সরকার তাঁকে ‘পদ্মশ্রী’ এবং ১৯৮৯ সালে ‘পদ্মভূষণ’ উপাধিতে ভূষিত করে। এছাড়াও ১৯৭৭ সালে ‘সংগীত নাটক একাডেমী অ্যাওয়ার্ড’ এবং ২০১০ সালে ‘সংগীত নাটক একাডেমী ফেলোশিপ’ পান গিরিজা দেবী।

২০১২ সালে বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের আমন্ত্রণে ঢাকার জাদুঘর মিলনায়তনে সংগীত পরিবেশন করেন গুণী এই শিল্পী। বেঙ্গল বারতার জন্য তার মুখোমুখি হয়েছিলেন তানভীর আলম সজীব

যে সময়ে আপনি গান শুরু করেছেন, সে সময় মেয়েদের গান গাইবার কতটুকু সুযোগ ছিল? সে সময়টা সম্বন্ধে কিছু বলবেন?

বাবা, রামদের রয় (রামদের রায়) ছিলেন জমিদার। তিনি গান-বাজনা খুব পছন্দ করতেন আর আমাদের যথেষ্ট উৎসাহ দিতেন। বাবার কারণেই গান শেখা শুরু। কিন্তু গান গাওয়া পেশা হিসেবে নেওয়াটা ভালো চোখে দেখা হতো না। গানকে পেশা হিসেবে নেওয়াটা এক রকম নিষেধ ছিল। তবে আমার বিয়ের পর ব্যাপারটা অন্যরকম হয়ে গেলো। আমার শর্ত ছিল, আমি তাকেই বিয়ে করব, যে আমার গান গাওয়াতে আপত্তি করবে না। আর তারও একটা শর্ত ছিল যে, আমি গান গাইতে পারব, কিন্তু শুধু মঞ্চে; কারও বাড়ির গানের আসরে নয়। আমরা দুজনই আমাদের শর্ত মেনে চলেছিলাম। এখন যারা সংগীত চর্চা করছে, তারা সে দিক থেকে অনেক ভাগ্যবান বলে আমি মনে করি। বাবা-মা, স্বামী-স্ত্রী থেকে শুরু করে সব ধরনের সম্পর্কেই এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি উদারতা আমি লক্ষ্য করেছি। গানের চর্চা করতে, সংগীতকে নিজের ভেতর ধারণ করতে এ ধরনের উদারতা অনেক বেশি প্রয়োজন। সময়ের বিবর্তনে মানুষের এ ধরনের মানসিক পরিবর্তনকে আমি সংগীতের স্বার্থেই সাধুবাদ জানাই।

মঞ্চে গাইবার ক্ষেত্রে আপনার কি মনে হয় যে, তাতে এক ধরনের অভিনয় দক্ষতারও প্রয়োজন আছে?

অভিনয় আর গান, দুটি ভিন্ন মাধ্যমের চর্চা। একজন অভিনয়শিল্পী যেমন তার কণ্ঠের সঙ্গে সঙ্গে নিজের বাচনভঙ্গিকে অনেক বেশি প্রাধান্য দেন, একজন সংগীতশিল্পী হিসেবে আমার ততোটা করার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। একজন অভিনয়শিল্পীর কণ্ঠের প্রক্ষেপণ আর বাচনভঙ্গি দুটোই সমান গুরুত্ব বহন করে। কিন্তু আমার কাছে কণ্ঠের গুরুত্বটাই বেশি। তবে হ্যাঁ, গানের বাণীর সঙ্গে, সুরের সঙ্গে একাত্ম হয়ে শ্রোতাদের সামনে গাইতে গিয়ে যদি আমার হাতটা নড়ে ওঠে বা আমার বাচনভঙ্গির তারতম্য হয়, তবে সেটা সেই সময়ের প্রয়োজনেই। আর সেটাকে এক ধরনের অভিনয়শৈলী বলা যায়। নিজেকে উপস্থাপন করাটা অভিনয়ের একটা অংশ। গান পরিবেশনের সঙ্গে তার গুরুত্ব অনেক। তবে গলায় সুর আর মনে তালের তালিম ছাড়া শুধু অভিনয়শৈলী দিয়ে সংগীত পরিবেশন অসম্ভব। তাই বলছি, সুর-তাল আগে; তারপর পরিবেশনের সময় অভিনয়টা একটা বাড়তি পাওনা।

আপনি ঠুমরি না খেয়াল, কোনটাতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন এবং কেন?

আমার কাছে সবটাই সুর। ঠুমরি বা খেয়াল কিংবা অন্যান্য যা কিছু আমি শিখেছি, সবেতেই আমি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। তবে ‘সময়’ তাতে অনেক বেশি প্রভাব ফেলে। আর আমার নিজের মনকে আমি খুব প্রাধান্য দেয়ার চেষ্টা করি। কোনো এক সকালে হয়তো আমার মন বলছে, ‘ঠুমরি গাও’, আবার কোনো সন্ধ্যায় বলল, ‘খেয়াল গাও’; আবার রাতে বলছে, ‘চৈতি গাও’। তাই আমি আমার মনের প্রসন্নতায় যা আসে, তাতেই স্বচ্ছন্দ থাকার চেষ্টা করি মাত্র। তবে এ প্রসঙ্গে এখনকার ছেলেমেয়েদের গানের ব্যাপারে একটা কথা না বললেই নয়- কিছু কিছু গান আমার মনে হয় ওরা ‘হট্টগোল’ করছে। মনে হয় ওদের মনে শান্তি বা প্রসন্নতার ভাটা পড়েছে। গান গাইতে হলে একটু স্বস্তির প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি। শ্রোতাদের সঙ্গে শিল্পীর একটা যোগাযোগ, আদান-প্রদানের মাধ্যম গান। ‘হট্টগোল’ করে সেই যোগাযোগটা কীভাবে হয়, আমি জানি না।

আপনার কোনটা পছন্দ- অনেক ছাত্র-ছাত্রী একসঙ্গে শেখানো, না কি একজনকে একলা শেখানো?

সময়ের কারণে অনেককে একসঙ্গে শেখাতে হয়। তবে সবার শেখার বা বোঝার ক্ষমতা তো কখনো এক রকম হয় না। তাই আমি নিজে একটু বেশি সতর্ক থাকি তাদের প্রতি, যারা শিখতে গিয়ে একটু বেশি সময় নেয়। অনেক দিন তো হয়ে গেল- তাই বুঝতে পারি, কার একটু আলাদা সময় প্রয়োজন। আমার যাকেই মনে হয় একটু কম বুঝেছে বা পিছিয়ে আছে আর সবার সামনে বলতে দ্বিধা করছে, তাকে আমি পরে আলাদা করে সময় দিয়ে শেখানোর চেষ্টা করি। আর তা না করলে আমি নিজে স্বস্তি পাই না। আমার পর আমার ছাত্র-ছাত্রীরা গাইবে, যাদের আমি শিখিয়ে যাচ্ছি। আমার গুরুদের কাছ থেকে আমি যা শিখেছি আর আমার জীবন থেকে যা রপ্ত করেছি- তা ঠিকঠাক মতো আমার ছাত্র-ছাত্রীদের শেখাতে না পারলে আমি নিজেই তো শান্তি পাব না। মাঝে মাঝে আমি ক্লাসে বসে শেখাতে শেখাতে আমার নিজের নাওয়া-খাওয়ার কথা ভুলে যাই। আমার মেয়ে মুন্নী আমাকে মনে করিয়ে দেয়, ‘মা, দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে, এবার ওদের ছাড়ো, তুমি খেতে এসো’।

আপনার কি মনে হয় পুরুষ কণ্ঠের চেয়ে মহিলা কণ্ঠে ঠুমরি বেশি শ্রুতিমধুর?

আমি অসাধারণ ঠুমরি শুনেছি ওস্তাদ আব্দুল করিম খাঁ, বাড়ে রামজি, বাড়ে গুলাম আলী খাঁসহ আরও অনেকের কণ্ঠে। তবে একজন মহিলা কণ্ঠ ঠুমরি অঙ্গে অন্যরকম একমাত্রা যোগ করে বলে আমি মনে করি। আর সেই শিল্পীর অবশ্যই সংসার ধর্ম সম্বন্ধে ধারণা থাকা প্রয়োজন। আমার মতে একমাত্র একজন বিবাহিত মহিলা শিল্পীই পারে ভালোবাসার নানান রকমের অনুভূতিকে বুঝতে এবং সেটা তার সংগীত চর্চার মাধ্যমে ঠুমরিতে ফুটিয়ে তুলতে। সে কারণে আমি বিয়ের আগ পর্যন্ত ছেলেমেয়েদের ভালোবাসা, মান-অভিমান, দুঃখ, কষ্ট- এ ধরনের কোনো গান শেখাই না। আমার মতে, বিয়ের আগ পর্যন্ত ছেলেমেয়েদের প্রকৃতি-প্রেম, আর সৃষ্টিকর্তার প্রেম, মানে ভক্তিগীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। কোনো সম্পর্কে না জড়ালে ‘সম্পর্ক’-এর ভাব, আনন্দ, ব্যথা একজন মানুষের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়।  আর না বুঝলে, সেগুলো নিয়ে গান গাইবে কী করে? জীবন দিয়ে না বুঝে শুধু চর্চা দিয়ে গান গাইলে তা কখনো মানুষের মনকে ছোঁয় না।

বর্তমান সময়ে আমাদের উপমহাদেশের অনেক নতুন সংগীতকার আছেন, যারা উচ্চাঙ্গসংগীতের সঙ্গে পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের সংগীতকে মিশিয়ে নতুন কিছু করছেন বা করার চেষ্টা করছেন। তাদের সম্বন্ধে আপনার মতামত কী?

প্রথম কথা হলো শিক্ষা। তুমি যদি আমাদের ক্লাসিক্যাল মিউজিকের সঙ্গে ওয়েস্টার্ন ক্ল্যাসিক্যাল মেলাতে চাও বা আফ্রিকান ফোক মিউজিক মেলাতে চাও, তাহলে তোমাকে দুটোই ভালো করে শিখতে হবে। তুমি যদি আমাদেরই দুই ধরনের গান, উচ্চাঙ্গ আর পল্লী অঙ্গের গান মেশাতে চাও, তবে তোমাকে শুধু গাইলেই চলবে না,  দুটো আলাদা অঙ্গ সম্বন্ধে পরিষ্কার ধারণা থাকতে হবে। পাঁচটা রাগ আর দশটা সিম্ফনি শিখেই তুমি যদি এদের একসঙ্গে মেশাতে যাও, তবে সব তালগোল পাকিয়ে যাবে। যে দুটি বা তিনটি ঘরানা তুমি একসঙ্গে মিশিয়ে নতুন কিছু করার চেষ্টা করছ, সেগুলো সবই তাদের নিজ নিজ জায়গায় স্বতন্ত্র থাকতে হবে। এতে করে তোমারও সুবিধা হবে শ্রোতাদের বোঝাতে। হাজার বছরের পুরনো মিউজিকের ফর্মেশন ঠিক রেখে যদি নতুন কিছুর সৃষ্টি হয়, তাতে আমি কোনো ক্ষতি দেখি না। তবে, আবারও বলছি, সেটা যদি ‘হট্টগোল’ হয়ে যায়, তাহলে আমার একটু আপত্তি আছে বৈকি।

কোনো অনুষ্ঠানে, মঞ্চে বসে গাইবার সময় আপনি কোনটাকে বেশি প্রাধান্য দেন, আপনার নিজের দাবী, নাকি শ্রোতাদের পছন্দ?

আমার মনই যখন আমাকে চালায়, তখন তাকে প্রাধান্য দেওয়া না-দেওয়া কিছু নেই। কখনো কখনো অনুষ্ঠানে যাবার আগে মনে হয় আজ এই গানগুলো গাইবো বা এই খেয়ালটা গাইতে খুব ইচ্ছে করছে, তারপর মঞ্চে উঠে শ্রোতাদের দেখে মনে হলো অন্য কিছুর কথা। শ্রোতাদের পছন্দের প্রাধান্য মাঝে মাঝে দিতেই হয়। তবে গান গাই আমার গুরুর জন্য, আমার স্রষ্টার জন্য। তাঁরা খুশি থাকলেই আমার গাওয়া সার্থক বলে আমি মনে করি। আর তাঁরা খুশি থাকলেই আমার শ্রোতারাও খুশি থাকবেন বলে আমার বিশ্বাস। আমার জীবনের অনেকটা অধ্যায় আমি পেরিয়ে এসেছি। আমি এটা হলফ করে বলত পারি যে, সংগীতের চেয়ে বড় আর কিছু নেই আমার কাছে। সংগীতেই আমি আমার স্রষ্টাকে খুঁজে পাই।

বাংলাদেশ আর দেশের মানুষ কেমন লাগলো?

আমার ৮৩ বছর বয়সে এই প্রথম বাংলাদেশে এলাম। আমার অনেক বাংলাদেশী ছাত্রছাত্রী পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে আছে। কিন্তু এর আগে বাংলাদেশে আমার আসা হয়ে ওঠেনি। আমার মনেই হয়নি যে আমি কোনো ভিনদেশে এসেছি। সবকিছু খুব চেনাচেনা লেগেছে। মানুষগুলো খুবই আন্তরিক। আর বাংলাদেশে এই ঘরানার গানের এতোটা কদর, আমার জানা ছিল না। আমি তো সেদিন অনুষ্ঠানে বলেই ফেললাম যে, আমাকে ওরা গান গাইতে ডাকল, কিন্তু অনেক দেরিতে। অনেক ভালো ভালো অনুভূতি নিয়ে ফিরে যাচ্ছি। আমাকে গাইতে ডাকার জন্য আর এমন সুন্দর আতিথেয়তার জন্য বেঙ্গল ফাউন্ডেশন কর্তৃপক্ষকে অসংখ্য ধন্যবাদ। অনেক আশীর্বাদ দেশের সবার জন্য।

 

ছবি: মিজানুর রহমান খোকা