শিল্পী ছাড়া অন্যকিছু হবো ভাবিনি

ভাস্কর তেজস হালদার জস অনেকের কাছেই পরিচিত এক নাম । বিশেষ করে আমাদের ভাস্কর্য শিল্পের হাল-হকিকত যারা জানেন তাদের কাছে তিনি এক নামে পরিচিত। দেশি বিদেশী বিভিন্ন প্রদর্শনীতে প্রসংশিত হয়েছেন তিনি এবং তাঁর শিল্পকর্ম। পেয়েছেন অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন গোল্ডমেডেল ২০০৪’ এবং এশিয়ান আর্ট বিয়েনাল ২০০৬’এর সম্মানজনক স্বীকৃতি। তার একটি শিল্পকর্ম স্থান পেতে যাচ্ছে বেলজিয়ামের গ্লোআর্ট গ্যালারিতে। আসছে নভেম্বরে ঢাকার এজ গ্যালারিতে তার একক শিল্প প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হবে। এসব নিয়েই আলাপ করতে গিয়ে  উঠে এসেছে তার শিল্পকর্ম এবং শিল্পী জীবনের নানা দিক। শোনা যাক তাঁরই জবানিতে

 শুরুর কথা

আমার ভাস্কর জীবন শুরু সম্ভবত দ্বিতীয় শ্রেণিতে থাকতেই। স্কুল থেকে বলেছিল মাটি দিয়ে কিছু একটা করে নিয়ে যেতে। তো আমি একটা গরু তৈরি করে নিয়ে যাই। সেই থেকে শুরু। তখন ভাস্কর হবো এরকমটা ভাবিনি, খেলাচ্ছলেই যা ইচ্ছে হতো বানিয়ে ফেলতাম। তবে শিল্পী না হয়ে অন্যকিছু হবো এমনটা ভাবিনি কখনও। আমার পরিবার থেকেও অন্যকিছু করতে চাপ দেয়নি বরং উৎসাহ পেয়েছি তাদের থেকে। যখন যা করতে চেয়েছি, করতে পেরেছি। ভালো ছবি আঁকতে পারতাম। স্থানীয় সব প্রতিযোগিতায় সবসময় পুরস্কার পেতাম। বলা যায় তখন থেকেই জীবনের লক্ষ্য স্থির করলাম শিল্পী হবো। তবে এসএসসি পাশ করে উচ্চমাধ্যমিকের সময়টাতে দুবছর রং তুলি থেকে দূরে ছিলাম। খুলনা থেকে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে ঢাকা চলে আসি। ঢাকা এসেই একদম পরদিন আমি চারুকলা (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট) খুঁজতে বের হয়ে যাই। চারুকলা ভর্তি কোচিং-এ ভর্তি হই। পরীক্ষা ভালো হলো, টিকেও গেলাম। ১৯৯৯-২০০০ শিক্ষাবর্ষে প্রথম পছন্দ- ভাস্কর্য বিভাগে ভর্তি হয়ে গেলাম। চারুকলা থেকে পড়াশোনা শেষ করে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন থেকে বৃত্তি নিয়ে চলে যাই শান্তিনিকেতন। ওখানে দুবছর পড়াশোনা শেষে আবার ফিরে আসি ঢাকায়।

সংযুক্তির অপেক্ষায় ব্রোঞ্জের শিল্পকর্ম

মূর্ত থেকে বিমূর্ত

ছাত্রাবস্থা থেকে আজকে পর্যন্ত আমার ভাবনা এবং কাজে পরিবর্তন এসেছে। শুরুর দিকে আমার কাজে অবয়ব বেশি প্রাধান্য পেত। এখন আমার মধ্যে বিমূর্ত ভাবনা বেশি কাজ করে। ‘রিয়েলিস্টিক’ কাজ থেকে এখন বিমূর্ত কাজ করতে বেশি আনন্দ পাই। ‘রিয়েলিস্টিক’ কাজ করতে করতে একসময় বিমূর্তের দিকে ঝুঁকে পড়লাম। একটা বিশেষ স্থান এবং সেখানখার রূপ ও রেখা অনুযায়ী বিমূর্ত স্থাপনা তৈরি করে দেখলাম লোকজন সেটা পছন্দ করছে। আর একটা বিমূর্ত ধারণাকে যতদিক থেকে উপভোগ করা যায় অবয়ব নির্ভর কাজকে ততদিক থেকে আসলে উপভোগ করা যায় না।

শিল্পের উপকরণ

বিভিন্ন উপকরণ নিয়ে আমি বিস্তর নিরীক্ষা করেছি ছাত্রাবস্থা থেকেই। এর মাধ্যমে আমার নিজস্ব কিছু কৌশল দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন উপকরণের আলাদা আলাদা গুণ আছে যাকে আমরা বলি ‘ম্যাটেরিয়াল প্রপার্টি’। প্রতিটি উপকরণের নিজস্ব কিছু গুণ এবং ভাষা আছে। ধাতব মাধ্যমের একরকম ভাষা আবার মাটি বা কাঠের আলাদা ভাষা। শুধু তাই নয়, একেক ধরণের ধাতু একেক ধরণের ‘ইমেজ’ বা দৃশ্যের অবতারণা করে। এতে করে মাধ্যম ব্যবহারের উপর নির্ভর করে শিল্পকর্মের ভাষাও বদলে যায়।

নিষ্প্রাণ কাঠ ভেদ করে বেরিয়ে আসছে বিমূর্ত অবয়ব

অন্যান্য কাজ

ভাস্কর্য নির্মাণের পাশাপাশি অন্যান্য কাজও করেছি। রুবাইয়াত হোসেনের চলচ্চিত্র মেহেরজান এর শিল্প নির্দেশনা দিয়েছি। তখন আমি শান্তিনিকেতনে স্নাতোকত্তর করছিলাম। ছুটিতে এসে কাজটি করেছি। তাছাড়া বেঙ্গল উচ্চাঙ্গসংগীত উৎসব এবং ঢাকা আন্তর্জাতিক লোকসংগীত উৎসবের স্মারক ভাস্কর্য নকশা করে দিয়েছি। এছাড়া একসময় থিয়েটারের সঙ্গেও যুক্ত ছিলাম। অল্পকিছুদিন যুক্ত ছিলাম প্রাচ্যনাটের সঙ্গে। তখন একটা নাটকের সাজসরঞ্জাম তৈরি করে দিয়েছিলাম।

ওপেন স্টুডিও

আমার স্টুডিওতে অন্যরাও আসে কাজ করতে। আগে ছোট একটু জায়গা ছিল। এখন বড় করেছি। এখানে জুনিয়রদের কিছুটা জায়গা ছেড়ে দিয়েছি কাজ করার জন্য। আর আমার স্টুডিও ব্যবহার করে কেউ কাজ করতে চাইলে আমি আপত্তি করি না। কারণ আমাদের দেশে ভাস্করদের জন্য কোনো ওপেন স্টুডিও নেই। তাই নতুনদের অনুশীলন কিংবা নিজের মতো করে কাজ করার সুযোগও নেই বললেই চলে। আর হ্যাঁ, আমার ইচ্ছা আছে একটা ওপেন স্টুডিও তৈরি করার। ভাস্করদের জন্য একটি সাধারণ জায়গা থাকা দরকার আছে যেখানে শিল্পীরা কাজ করবে, প্রদর্শনী করবে।

একজন শিল্পীর দায়-ভার

সামাজিকভাবে কিছু সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় শিল্পীদের। অনেক সময় আমরা সক্ষম হই না – শিল্প মূল্য কি সেটা বোঝাতে। সেটা দুঃখজনক। তবুও যখন কোন ‘স্পেস’ নিয়ে কাজ করি তখন মনে হয় আসলে আমি সমাজের জন্যই কাজ করছি। সমাজের জন্য শিল্পী হিসেবে আসলে আমার দায়বদ্ধতা এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।

চলছে ঝালাইয়ের কাজ

 স্বকীয়তা

কোনো ভাস্করের কাজ দ্বারাই আমি প্রভাবিত না। যেমন, ভাস্কর সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ আমার অত্যন্ত পছন্দের এবং শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি। তাঁর শিল্পকর্ম আমার খুব প্রিয় কিন্তু আমি প্রভাবিত নই। এমনকি তৃতীয় বর্ষ পর্যন্ত আমি ভাস্কর্যের বই খুলে কোন ছবি দেখতাম না- শুধু পড়তাম। যাতে আমার কাজে অন্য কারও প্রভাব না পড়ে। তবুও আসলে প্রতিটি কাজ ‘ইউনিক’ নাও হতে পারে। একইরকম উপকরণ নিয়ে হয়ত দুই মহাদেশের দুজনের কাজ একইরকম হতেই পারে। হুবহু না হলেও ধারণার জায়গায় সাদৃশ্য থাকতেই পারে।

 এখনকার প্রিয় শিল্পী

অনেকেই ভালো কাজ করছে। মাহবুব ভাই (মাহবুবুর রহমান), লিপি আপা (তৈয়বা বেগম লিপি) সহ অনেকের কাজ ভালো লাগে।

প্রদর্শনীর কথা   

প্রথম একক প্রদর্শনী করেছিলাম ২০০৭ সালে- বেঙ্গল গ্যালারিতে। এর মাঝখানে বেশকিছু দলগত প্রদর্শনীতে আমার ভাস্কর্য প্রদর্শিত হয়েছে। তবে আবার একক প্রদর্শনী করতে চাই নভেম্বর মাসে। তারই প্রস্তুতি চলছে। আসছে নভেম্বরের ৪ তারিখ আশা করছি প্রদর্শনীর উদ্বোধন হবে গুলশানের এজ গ্যালারিতে। দুটি প্রদর্শনীর মাঝে শুধু সময় নয়, ভাবনা এবং শিল্পকর্মের ধরণেও ব্যপক তফাত। আগের প্রদর্শনীতে রিয়েলিস্টিক এবং অবয়ব নির্ভর কাজ বেশি ছিল এবারটাতে ঠিক উল্টো।

ভাস্কর্য নির্মাণে মগ্ন শিল্পী

নভেম্বরের প্রদর্শনীতে আমার তিন ধরণের কাজ থাকবে। ব্রোঞ্জ, ঝালাই, এবং কাঠ। এখন ব্রোঞ্জের কাজগুলো তৈরি আছে, কম্পোজ করলেই হবে। ঝালাই এবং কাঠের কাজ এখনও চলছে। অল্পকিছু ভাস্কর্যের কাজ শেষ। সেগুলো এরমধ্যেই গ্যালারিতে নেওয়া হয়েছে। আশা করছি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই বাকি কাজ শেষ হবে।  মানুষ, সম্পর্ক, পরিবেশ, সমাজ, রাজনীতি বিভিন্ন বিষয় ছুঁয়ে যাবে এসব শিল্পকর্ম। ‘রান’(RUN) নামে একটা সিরিজ করার ইচ্ছা ছিল। ব্রোঞ্জের কাজগুলো মূলত রান সিরিজের, কাঠের কাজগুলো আমার ব্যক্তিজীবন নিয়ে এবং ঝালাইয়ের কাজগুলোর ধারণা এসেছে কর্পোরেট আচরণ থেকে। মূলত মানুষ, সমাজ, সম্পর্ক ইত্যাদি নিয়েই এসব ভাস্কর্য। আর এ সবকিছুই আসলে একটি আরেকটির সঙ্গে জড়িত। মোট ২৫টি ভাস্কর্য রাখার ইচ্ছে আছে এ প্রদর্শনীতে। তাই প্রাথমিকভাবে একটা শিরোনাম ঠিক করলেও সামনে প্রদর্শনীর শিরোনামে পরিবর্তন আসতে পারে।

ছবি: মো: আফজালুর রহমান