শিল্প সতিন সহ্য করে না

লেখালেখির উৎসাহ মিশে আছে রক্তে। তাই প্রকৌশলী হয়েও হাতে রেখেছেন কবিতার খাতা, বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও স্থিত হননি সেখানে। সরকারি চাকরি ছেড়ে ১৯৯৬ তেই সাংবাদিকতা করতে শুরু করেন বাংলাদেশের অন্যতম পাঠকপ্রিয় কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক। প্রতিভার প্রমাণ রেখেছেন কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার এমনকি গীতিকার হিসেবেও। একে একে অর্জন করেছেন টেনাশিনাস পদকসহ বেশ কয়েকটা পুরস্কার। সাহিত্যের জন্য পেয়েছেন খুলনা রাইটার্স ক্লাব পদক, কবি মোজাম্মেল হক ফাউন্ডেশন পুরস্কার। ২০১২ সালে কথাসাহিত্যে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান তিনি। নিজের লেখক সত্ত্বা মেলে ধরলেন বেঙ্গল বারতার সামনে…

আজকের এদিন ছেলেবেলার দিনগুলোর রূপান্তর

আগের রাতে ছিলেন বেঙ্গল উচ্চাঙ্গসংগীতের আসরে। সেই রাতজাগা লাল চোখেই মুখোমুখি হলেন আনিসুল হক। হাস্যোজ্জ্বল এই মানুষটির অনেক পরিচয়। সাংবাদিক, কবি, প্রাবন্ধিক, সাহিত্যিক, কলাম লেখক, নাট্যকার। যেকোনো একটি পরিচয় দিতে বলা হলে কোন পরিচয়টি দেবেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে আনিসুল হক বলেন, ‘আমি একজন সৃষ্টিশীল মানুষ, এটাই আমার পরিচয়।’ রংপুরে কাটানো ছেলেবেলায় পাড়ার বিয়ে, ঘরোয়া অনুষ্ঠানে কিংবা যেকোনো উৎসবের সজ্জায় ডাক পড়ত তাঁর। রঙিন কাগজ-হার্ডবোর্ড কেটেকুটে বাহারি গেট কিংবা মঞ্চসজ্জায় আনতেন নতুন রূপ। ছবিও আঁকতেন বেশ। তার ছোটবেলার প্রথম পরিচয় নাকি চিত্রশিল্পীর। এটাসেটা দিয়ে ঘর বানাতেন, গাড়ি বানাতেন। সৃষ্টিশীলতা তাঁর সেই তখন থেকেই। দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় একটা নাটকও লিখেছিলেন। ক্লাস শেষে প্রতিদিন সে নাটকের মহড়া হতো। যদিও শেষ পর্যন্ত নাটকটি আর মঞ্চস্থ হয়নি।

তুই কি আমার দুঃখ হবি?

পুরকৌশল বিভাগের ছাত্র আনিসুল হক বুয়েটে পড়ার জন্য ঢাকায় আসেননি। জানালেন, তাঁর ঢাকায় আসার উদ্দেশ্য ছিল কবি হওয়া। সে উদ্দেশ্য যে বেশ সফল সেটা তাঁর কবিতার দিকে তাকালেই বোঝা যায়। ‘তুই কি আমার দুঃখ হবি?’ এই প্রশ্নসূচক শিরোনামের কবিতাটি তো তুমুল জনপ্রিয়। প্রশ্ন ছিল- দেশে বেড়েই চলছে বিচ্ছেদের হার, প্রেমিক নেই আগের মতো আর প্রেমিকারাও কেমন যেন। সেখানে আপনার এই দুঃখ হওয়ার আবেদনে সাড়া মেলে কেমন? কবি হাসলেন। বললেন, সুখী হওয়ার চেয়ে দুঃখী হওয়া অনেক সহজ। কাউকে সুখী হওয়ার প্রস্তাব দিলে সহজে সাড়া মিলবে না। অথচ দুঃখ হতে বললে রাজি হয়ে যায় প্রেমিক মন। কবিতাটি প্রকাশের পর অনেক পাঠক ফোন দিয়ে বলেছেন, ‘আপনার এই কবিতার কারণে আমার প্রেমটি হয়ে গেছে।’

ইতিহাসনির্ভর সাহিত্য

ইতিহাসনির্ভর সাহিত্য বাংলাদেশে তেমন একটা দেখা যায় না। ইতিহাস বিষয়ে জানার জন্য অনেকেই ইতিহাসনির্ভর গল্প-উপন্যাস পড়তে চান। এতে একসাথে দুটো লাভ। ইতিহাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তো জানা যায়, সেই সাথে সাহিত্যপাঠের আনন্দও ধরা দেয় পাঠকচিত্তে। ইতিহাসের প্রমাণ-নির্ভর সত্যের সাথে জীবননির্ভর সাহিত্যের একটা দ্বন্দ্ব কিন্তু থেকেই যায়। এমন দ্বন্দ্বকে পাশ কাটিয়ে দেশে বেশ কিছু সুপাঠ্য গল্প-উপন্যাসের দেখা মেলে। আনিসুল হকের ‘মা’ উপন্যাসটি তেমন একটি ইতিহাসনিভর্র উপন্যাস। বেশ কয়েকটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে উপন্যাসটি। দেশে বইটির বিকিকিনি এত বেশি যে, এ পর্যন্ত ৬০ বার মুদ্রিত হয়েছে। সব মিলিয়ে দেশে ইতিহাসনির্ভর সাহিত্যের ভবিষ্যৎ কেমন? এমন প্রশ্ন করতেই লেখক বললেন, ‘ইতিহাসনির্ভর সাহিত্য নিয়ে চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। বরং বাংলাদেশের পুরো সাহিত্য নিয়ে ভাবতে হবে। সামগ্রিক সাহিত্যের উন্নয়ন হলেই ভালো ইতিহাসনির্ভর গল্প-উপন্যাসের দেখা মিলবে। এ সময়ের লেখকরা বেশ তরুণ। ঐতিহাসিক কোনো সময়ের সাথে সম্পৃক্ত না থাকলে অথবা অনেক বেশি পড়াশুনা না থাকলে ইতিহাসকে উপজীব্য করে সাহিত্য রচনা করা বেশ কঠিন।’

ফেসবুক-ইন্টারনেটে পাঠক ব্যস্ত

বই বিক্রির হার কমে যাচ্ছে, দেশে-বিদেশে অনেক লাইব্রেরি বন্ধ হয়ে গেছে। তরুণ-তরুণীরা ফেসবুক-ইন্টারনেটসহ অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে বেশি সময় দিচ্ছে। গল্প-উপন্যাস পড়ার সময় কই? এমন প্রশ্ন রেখে আনিসুল হক বললেন, ‘এখন তো এমন হয়েছে যে, আপনার লেখার দৈর্ঘ্য তত বড় হবে যত বড় টুইটার কিংবা ফেসবুকে লেখা যায়। পাঠকরা এখন বড় লেখা গ্রহণ করতে পারছে না। এটা ফেসবুকের প্রভাব কিনা সেটা নিয়ে গবেষণাও হচ্ছে। অনেক লেখক তো ফেসবুকের কল্যাণে স্ট্যাটাস লেখকও বনে যাচ্ছেন। সামাজিক মাধ্যমগুলোতে খুব সময় দেওয়া মানুষগুলোর এ অভ্যাসকে খারাপ ভাবারও কোনো অবকাশ নেই। এই প্রজন্মের ফেসবুকপ্রীতির এ অভ্যাস ভালো না খারাপ সে রায় দিচ্ছি না। তবে ফেসবুকে লেখালেখি করা লেখকদেরই সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা ফেসবুক সেলিব্রেটি হতে চায় না লেখক হতে চায়।’

শিল্প সতিন সহ্য করে না

বাংলাদেশে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বাংলাদেশ রেল বিভাগে যোগ দিয়েছিলেন আনিসুল হক। কিছুদিন পর সে চাকরি ছেড়ে আবার ফিরে আসেন সাংবাদিকতায়। এখনও কেউ ভালো চাকরি ছেড়ে সাংবাদিকতা কিংবা লেখালেখিতে মনোনিবেশ করলে অন্য সব উদাহরণের সাথে আনিসুল হকের এ উদাহরণটি দিতে ভোলেন না। রেল বিভাগের চাকরি ছেড়ে কেন সাংবাদিকতায় সে প্রশ্নের উত্তর দিলেন আনিসুল হক। বললেন, ‘শিল্প কখনও সতিন সহ্য করে না। একই সাথে অনেক কিছু হওয়া সম্ভব না। শিল্পের ক্ষেত্রে সেটা আরও বেশি সত্য। কিছু পেতে হলে কিছু ছাড়তে হবে, নিজেকে পোড়াতে হবে। নিজেকে পুরো নিমজ্জিত করতে পারলেই শিল্প তার পুরোটা নিয়ে হাজির হয়।’

লেখকদের কর্মশালা

২০১০ সালে আনিসুল হক আমেরিকার ইন্টারন্যাশনাল রাইটিং প্রোগ্রাম আইডব্লিউপি কর্মশালায় যোগ দিয়েছিলেন। তিনি ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ৩৭ জন লেখক আইডব্লিউপির কর্মশালায় যোগ দেন। বিশ্বের অনেক নামকরা লেখকদের সান্নিধ্য মেলে এখানে। কর্মশালা কিংবা প্রশিক্ষণ লেখকদের জন্য কতটা প্রয়োজন তা নিয়ে বিভিন্ন মত আছে। তবে কর্মশালা লেখদেরকে বিভিন্ন বিষয়ে লিখতে উৎসাহ দেয়। বিশেষ করে তা যদি হয় বিভিন্ন দেশের লেখকদের সাথে তবে সেটা অবশ্যই বেশ উপকারী বলেই মনে করেন আনিসুল হক। কবিতার এই যে এত বৈচিত্র্য সেটা অন্য দেশের কবি ও কবিতার দিকে তাকালেই বোঝা যায়। আড্ডা আর গল্পের মধ্য দিয়ে বের হয়ে আসে বৈচিত্র্যময় সাহিত্যর নানা দিক, যা একজন লেখকের লেখার বিষয়ে নতুন দুয়ার খুলে দেয়।

কবি হতে বাউণ্ডুলে হওয়ার প্রয়োজন নেই

ব্যক্তিগত জীবনে আনিসুল হক বেশ শৃঙ্খল। ১১টার মধ্যেই ঘুমোতে যান। ওঠেন ভোরের আলো ফোটার আগেই। প্রতিদিন না লিখলেও পড়েন তো অবশ্যই। জনপ্রিয় এ লেখক বললেন, ‘আমি অত্যন্ত গৃহী জীবন যাপন করি। কবি হতে হলে যে উসকো-খুসকো চুল হতে হবে, আড্ডাবাজ হতে হবে সেটার প্রয়োজন নেই।’