শীতের নাচন হিমেল হাওয়ায়

শীত শব্দটিই কাঁটা দেয় গায়ে। ধেয়ে আসে হিম বাতাস। কুয়াশা নামের প্রাকৃতিক চাদরে ঢাকা পড়ে চরাচর। পৃথিবীকে শস্যশ্যামলা ও উষ্ণতায় বেঁধে রাখা সূর্য চলে যায় বেড়াতে। এর মাঝে সকালবেলার নরম রোদ দুষ্টু চড়ুইয়ের মতো খেলা করে উঠোনে। তুলতুলে স্পর্শে মন শিহরিত হয়। গুনগুন করে, ‘শীতের হাওয়ার লাগল নাচন আমলকির এই ডালে ডালে/ পাতাগুলি শিরশিরিয়ে ঝরিয়ে দিল তালে তালে।’

এমন হিমখেয়ালি দিনে বাংলা রূপ বদলায় নিজস্ব রীতিতে। আসে উৎসবের দিন- রবীন্দ্রনাথ আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন সেই পৌষের, যেখানে ডালা ভরে ওঠে পাকা ফসলে, হাওয়ার নেশায় মাতে দিগ্বধূরা ধানের ক্ষেতে- রোদের সোনা ছড়িয়ে পড়ে মাটির আঁচলে। তাই দেখে মনে হয়, এ কী মায়া, লুকাও কায়াজীর্ণ শীতের সাজে/ আমার সয় না, সয় না, সয় না প্রাণে, কিছুতে সয় না যে…

ঘরে ঘরে নতুন ধান ওঠে। ধানের সঙ্গে পিঠাপুলির সম্পর্ক অনিবার্য। পিঠাছাড়া শীতের সকালটাই যেন মাটি। ঘরে ঘরে পিঠা খাওয়া। আজও মনে পড়ে চুলার পাশে বসে গরম গরম পিঠার স্বাদ। সরষে বা ধনেপাতার বাটা অথবা শুঁটকির ভর্তা মাখিয়ে চিতই পিঠা মুখে দিলে ঝালে কান গরম হয়ে শীত পালায়। আর সে কী বাহারি পিঠার নাম- দুধখেজুর, সতীনের মোচড়, গড়াগড়ি, কুশলী, গোলগোলা, মালপোয়া, রসগজা, চন্দনপাতা, কাঁঠালপাতা, ধুপি…।

শীতের সাথে জড়িয়ে আছে সাংস্কৃতিক চর্চাও। গেরস্তের হাতে নতুন ফসলের টাকা এলে বাড়ে খানাপিনা আর দিলখোলা মনোরঞ্জন। কবিগান, জারিপালা, মুর্শিদি গান, মাঘী পূর্ণিমা, মানিক পীরের গান, পুতুলনাচ, মাদার বাঁশের জারি, মাইজ ভাণ্ডারি গান- সবগুলোরই আসর যেন পূর্ণতা পায় শীতের রাতে। কুয়াশার রাতে যতই ঠাণ্ডা হাওয়ার কাঁপুনি থাকুক, যাত্রাপালা শুনতে যাওয়ার সেসব স্মৃতি কি ভুলবার? আমাদের দাদার বাড়িতে যাত্রার কলাকুশলীর একটা বড় অংশই ছিল গ্রামের সাধারণ কৃষক, কামার, কুমার, মুটে, ভ্যানচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। আমাদের শহরের নিউ টাউনের বাড়ির পাশে আশির দশকের মাঝামাঝি এই যাত্রার আসর হতে দেখেছি। সেইসব এখন সত্যিই স্মৃতি। তবু শীত মানেই উৎসব, ফসলের উল্লাস।

অবশ্য এর উল্টো দিকটাও দেখি। জীবনানন্দ যেমনটি শীতের মধ্যে দেখেছেন- মৃত্যু, জ্বরা, ক্ষয় শীতের মাঝে। গাছের মৃত্যু, ফসলের হাসি। এ এক অমোঘ নিয়তি- কৃষকের রক্তঘামে ফসল পরিপক্ব হয়, বীজ রেখে গাছের বিদায়। জীবনানন্দ বলছেন, ‘এই সব শীতের রাতে আমার হৃদয়ে মৃত্যু আসে;/ বাইরে হয়তো শিশির ঝরছে, কিংবা পাতা,/ কিংবা প্যাঁচার গান; সেও শিশিরের মতো, হলুদ পাতার মতো।/ শহর ও গ্রামের দূর মোহনায় সিংহের হুঙ্কার শোনা যাচ্ছে-/ সার্কাসের ব্যথিত সিংহের।’

মঙ্গল কাব্যগুলোতেও শীতের উপস্থিতি লক্ষণীয়। অধিকাংশ মঙ্গলকাব্যে নায়িকাদের বারো মাসের দুঃখ বর্ণনা-সূত্রে শীত ঋতুর আবির্ভাব। শীত এখানে যত না আনন্দের অনুষঙ্গ, তার চেয়ে অনেক বেশি বেদনার শোকগাথা। বাঙালির হাজার বছরের দুঃখের কথাই যেন ফুল্লরার মুখ দিয়ে মুকুন্দরাম প্রকাশ করেছেন, শীত ঋতু নিম্নবর্গের অসহায় নারী ফুল্লরার জীবনে এসেছে চরম দুঃখ নিয়ে। ফুল্লরার এই দুঃখের অনুষঙ্গে শীত ঋতু সম্পর্কে বাঙালির একটি লোকসংস্কারের কথাও ব্যক্ত করেছেন মুকুন্দরাম। বাংলাদেশের কোনো কোনো অঞ্চলে এই লোকবিশ্বাস প্রচলিত আছে যে, মাঘ মাসে ক্ষেত থেকে শাক তুললে গৃহস্থের অকল্যাণ হয়। ফুল্লরার মুখ দিয়ে মুকুন্দরাম তাই বলছেন, ‘ফুল্লরার কত আছে কর্মের বিপাক-/ মাঘ মাসে কাননে তুলিতে নাহি শাক।’

কেন মাঘে শাক তুলতে নেই তা জানা নেই আমার। খনার মতো এটাও মুকুন্দরামের কোনো প্রবাদ-বচন কিনা! তবে শীতে পালং শাক, লাল শাক থেকে শুরু করে সবজির যে বিশাল সমারোহ তা নিরামিশাষীদের ভোজনরসনায় সুড়সুড়ি দেয় নিশ্চয়। উত্তরাঞ্চলে একধররের শাক পাওয়া যেত, স্থানীয় ভাষায় ওকে নাফা শাক বলে। পাতাটা খাঁজকাটা গোলাকার। ঢাকায় প্রতিটি বাজার তন্ন তন্ন করে খুঁজেও পাওয়া যায়নি সেই শাক। এই নাফা শাক মাছ দিয়ে ঝোল করে না খেতে পারার কষ্ট ভুলবার নয়! এ এক অন্য রকম মনখারাপের অনুভূতি। এ এক অন্য স্মৃতিকাতরতা; শীতলতার নামান্তর।

কি গ্রাম কি শহর- শীত এলে জানা যায় অস্থিমজ্জায়। শীত ঢুকে পড়ে শালগম-ফুলকপির দানাদার জীবনে। পেরেকের মতো শীত। যতটুকু জানা যায়, আমাদের দেশে তুষারপাতের ইতিহাস একবারই, ১৯০৫-০৬ এর দিকে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঋতুবৈচিত্র্য এখন বেশ পরিবর্তিত। পশ্চিমের তুলনায় আমাদের শীত অতটা করাতের মতো নয়। তবে তাকে একেবারে কাগুজে বাঘও বলা চলে না। উত্তরাঞ্চলসহ দেশের কোথাও কোথাও তাপমাত্রা নেমে যায় ৬-৭ ডিগ্রি পর্যন্ত। তীব্র হুল ফোটানো সেই শীতে জনজীবন সত্যিই স্থবির হয়ে ওঠে। আমরা রাজধানীতে বসে সেই হাড়কাঁপানো অনুভূতি যা টের পাই সেটাও কম নয়। তখন রাস্তায় চা বিক্রি করা শিশুটিকে দেবশিশু বলে মনে হয়। কিন্তু আমরা কি দেখি ওর শরীরে পর্যাপ্ত গরম জামা আছে কি না?

এই শীতে পথে বের হওয়াও বেশ ঝক্কির। তবে শুকনো আবহাওয়ার ফায়দা নিতে হলে এই সময়ের কোনো বিকল্প নেই। বাংলার উৎসবের রূপ হোক আর নিসর্গই হোক, এই শীত অনবদ্য। এখনই পাকা ধানের শিসে শিশিরবিন্দু হেসে ওঠে স্বর্ণকণিকার মতো। এই হাসি-উৎসবে কাটুক সময়। হিম সমীরণ থেকে বেরিয়ে আসুক উত্তাপের হল্কা। যেমন মৃত্যুর পর নবজীবন। শীতের বনে গোপনে সাজিয়ে রাখা দুখের সুরে বরণ মালা পেরিয়ে লেখা হোক নবজন্ম। কবিগুরু যাকে বলেছেন ‘বসন্তবালক’। ‘বসন্তবালক মুখ-ভরা হাসিটি, বাতাস ব’য়ে ওড়ে চুল শীত চলে যায়, মারে তার গায়/ মোটা মোটা গোটা ফুল।’

আসুন, আহত হই পুষ্পবাণে, দাঁড়াই শীতার্তদের পাশে। তাতেই সফল হবে বসন্তের গুপ্ত প্রস্তুতি…

 

ছবি: অভিজিৎ কর গুপ্ত