সংগীতকন্যা ফেরদৌসী রহমান

পল্লীগীতির সম্রাট আব্বাসউদ্দীন আহমদের কন্যা। সংগীতের সঙ্গেই নিত্য ওঠাবসা। খুব ছোটবেলা থেকে সংগীতে ঢেলেছিলেন মনপ্রাণ। সংগীতও তাঁকে দিয়েছে দুহাত ভরে। সেই কৈশোরেই পুরস্কার আর ট্রফিতে ভরে গিয়েছিল ঘর। আজকের বাংলাদেশ টেলিভিশনের সূচনা হয়েছিল তাঁর গাওয়া গান দিয়ে। আমাদের সংগীতভুবন আলো করে থাকা শিল্পী ফেরদৌসী রহমান মুখোমুখি হলেন বেঙ্গল বারতার।

আপনি তো বাংলাদেশ টেলিভিশনের প্রথম শিল্পী। আমাদেরকে সেই অভিজ্ঞতার কথা বলবেন কি?

সেটা ১৯৬৪ সালের ডিসেম্বর মাস। সেই সময় কলিম শরাফী সাহেব ছিলেন টেলিভিশনের জিএম। তখন মুস্তাফা মনোয়ারও ছিলেন। উনারা বললেন টেলিভিশনে গান করতে হবে। আমি রাজি হলাম। ডিআইটি ভবনের নিচতলায় সেদিন রাজ্যের উত্তেজনা। কাগজে মোড়ানো সেট তৈরি হয়েছিল আগেই। একপাশে যন্ত্রীরা বসেছেন। আমার পরনে ছিল সবুজ শাড়ি। শীতের কারণে একটা লাল চাদর জড়িয়ে নিয়েছিলাম। সামনে ক্যামেরাম্যান তৈরি। খানিক পরেই জ্বলে উঠল লাল বাতি। গান শুরু করার নীরব সংকেত। যন্ত্রীদের বাজানোর সঙ্গে সঙ্গে আমি গাইলাম ‘ওই যে আকাশ নীল হলো আজ…’। দুটো কি তিনটা গান গেয়েছিলাম। কোনোরকম এদিক-ওদিক ছাড়া গান আর ছবি ঠিকঠাক বন্দি হয়ে গেল ক্যামেরায়। টেলিভিশনের প্রথম শিল্পী হব, প্রথম গান গাইব- এটা তখন আমার মাথাতেই ছিল না। বাতি জ্বলল আর আমি গাইতে শুরু করলাম। খুব আলাদা কোনো অনুভূতি কাজ করেনি। তবে সেটা আমার টেলিভিশনে প্রথম গান গাওয়ার অভিজ্ঞতা নয়, এর আগেই সরকারি প্রতিনিধিদলের হয়ে রাশিয়া গিয়েছিলাম। টেলিভিশনের জন্য গান গাওয়ার প্রথম অভিজ্ঞতা হয়েছিল সেখানেই।

১৯৬৫ সালে সর্বকনিষ্ঠ সংগীতশিল্পী হিসেবে আপনি পেয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট প্রাইড অব পারফরম্যান্স পুরস্কার। এরপর একে একে আপনার হাতে উঠে এসেছে সেরা টিভিশিল্পী, সংগীত পরিচালকের জাতীয় পুরস্কার, একুশে পদক, নাসিরুদ্দীন স্বর্ণপদক, মাহবুবুল্লাহ স্বর্ণপদক থেকে শুরু করে অগণন পুরস্কার ও স্বর্ণপদক। সংগীতে এই যে পথচলা, এটা কি বাবার হাত ধরেই শুরু?

হ্যাঁ, সেটাই তো স্বাভাবিক। আমি বাবার কোলে বসে গান শুনতাম, শিখতাম। এভাবেই পথচলার শুরু। তবে বাবা ছাড়াও আমাকে সংগীতের শিক্ষা দিয়েছেন মোহাম্মদ হোসেন খসরু, ইউসুফ খান কোরাইশী, কাদের জামেরী, নাজাকাত আলী খানের মতো নামজাদা ওস্তাদেরা। সেই ছোটবেলা থেকে গান গেয়ে এসেছি মনের আনন্দে। প্রাপ্তির আশায় কিছু করিনি। কিন্তু না চাইতেই খোদা এত কিছু দিয়েছেন যে কৃতজ্ঞতায় চোখে জল এসে যায়। পুরস্কারের এই ক্রেস্টগুলো হয়তো আমার ঘর আলো করবে, কিন্তু আমার জীবন আলো করবে মানুষের ভালোবাসা।

শৈশব মানুষের সঙ্গে সঙ্গেই চলে। মন কি কাঁদে শৈশবের জন্য?

প্রতিটি মানুষ তার শৈশবের সুখস্মৃতি অবলম্বন করে সুখ পায়। আমাদের বাড়িটা ছিল সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে ঘেরা। আব্বা, কবি গোলাম মোস্তফা, কাজী নজরুল ইসলাম, চিত্রশিল্পী কাজী আবুল কাশেম- আমরা ছিলাম এক পরিবারভুক্ত। ফলে তাঁদের সন্তানদের সঙ্গে আমাদের সখ্য ছিল। আমরা একই সঙ্গে বড় হয়েছি। আমাদের পুরানা পল্টনের বাসায় প্রায়ই গানের আসর বসত। সেই আসরে যোগ দিতেন কবি জসীমউদ্দীন, শিল্পী আবদুল লতিফ, আবদুল আলীমসহ অনেকেই। আমরা ছোটরা ছিলাম সেই আসরের অন্যতম শ্রোতা। এভাবে সংগীতে তালিম নিতাম। হোক তা উচ্চাঙ্গসংগীত, লোকসংগীত বা যেকোনো সংগীত। আমাদের মধ্যে শিল্পের নান্দনিক চর্চার একধরনের প্রতিযোগিতা চলত- পড়াশোনায়, সংগীতে, চিত্রকলায় কে বেশি ভালো করতে পারে।

শুধু গান নয়, আমরা জানি প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ায়ও আপনার সাফল্য অবাক করার মতো। একটু জানাবেন কি?

আসলে জানানোর মতো কিছু না। ম্যাট্রিকে মেয়েদের মধ্যে প্রথম হয়েছিলাম। এইচএসসিতে সম্মিলিত মেধাতালিকায় দ্বাদশ অবস্থানে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগ থেকে মাস্টার্স শেষ করি ১৯৬২ সালে। ১৯৬৩ সালে ইউনেসকো ফেলোশিপ নিয়ে চলে যাই লন্ডনের ট্রিনিটি কলেজ অব মিউজিকে।

সাড়া জাগানো ছবি আসিয়া দিয়ে শুরু করেছিলেন সিনেমার গান। এরপর প্রায় ২০০ ছবিতে গান করেছেন।

১৯৪৮ সালে খেলাঘরের অনুষ্ঠানে প্রথম রেডিওর জন্য গান গেয়েছিলাম। ১৮ বছর বয়স না হলে বড়দের অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার নিয়ম ছিল না তখন। সেই নিয়মের বেড়াজালে আমি আটকে থাকিনি। আসিয়া ছবি দিয়ে শুরু করে পরে ‘সাতটি রঙের মাঝে আমি মিল খুঁজে না পাই’, ‘যার ছায়া পড়েছে মনের আয়নাতে’, ‘আমি কার জন্য পথ চেয়ে রব’সহ মোট ২০০টি সিনেমায় গান গেয়েছি।

আশির দশকের শুরুর দিক থেকেই বিটিভির দারুণ জনপ্রিয় এক অনুষ্ঠান এসো গান শিখি। এখনো চোখে ভাসে সেই হাস্যোজ্জ্বল খালামণির মুখ?

হা হা হা। হুমম। ‘এসো গান শিখি’ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শিশুদের গান শিখিয়েছি। তাদের কাছে পেয়েছি। তাদের কাছে গিয়েছি। অন্য রকম এক অভিজ্ঞতা। গান শেখানোর পাশাপাশি মিঠু ও মন্টি নামের দুই পাপেটের সঙ্গে মজার কথোপকথন। এটাই ছিল এসো গান শিখির প্রাণ। সময়ের সঙ্গে পাল্টেছে অনেক কিছু। এসো গান শিখি অনুষ্ঠানে সা.সা.সা.সাত স্বরের রাজা, রা.রা.রা.রেলগাড়িতে চড়ে…গাইত যারা, তারা আজ অনেকে নিজেরাই খালামণি হয়ে গেছে।

সারাটা জীবন নকল সুর আর নকল গানের বিরুদ্ধে ছিলেন। সেই লড়াইটা অব্যাহত রেখেছেন এখনো?

আমি মন থেকে বিশ্বাস করি, শিল্পীরা সচেতন হলে নকল গান ঠেকানো খুবই সহজ। শিল্পীরা যদি বলেন, নকল গান গাইব না, তাহলেই তো নকল গান বন্ধ হয়ে যায়। কেন নকল করতে হবে? কেন হতে হবে অন্যের দ্বারস্থ? আমরা কম কিসে? সংগীতে-সংস্কৃতিতে আমাদের কি ছিল না গৌরবময় অতীত? রাজধানীর বুকে’র মতো ছবির গান করে আমরা হুলুস্থুল ফেলে দিইনি? গোটা পাকিস্তান মাতোয়ারা হয়েছে আমাদের গাওয়া গানে। চান্দা, তালাশ- এসব সাড়া জাগানো ছবির গান লেখা, সুর করা সব বাঙালিরাই তো করেছে। আমরা তো কারও চেয়ে কম নই কোনো দিক দিয়ে। কিন্তু এ কথাটা আমরা কীভাবে ভুলে গেলাম। ভাবতে অবাক লাগে।

আমরা জানি, বাংলা ছাড়া আরও বেশ কয়েকটি ভাষা এবং গানে দখল আছে?

বাংলা ছাড়া আমি উর্দু, ফারসি, আরবি, চীনা, জাপানি, রুশ, জার্মানসহ আরও বেশ কিছু ভাষায় গান গেয়েছি।

গানের একাল-সেকাল নিয়ে কিছু বলবেন?

দেশে এখন সংগীত প্রতিভা অন্বেষণের একাধিক প্রতিযোগিতা হয়। দেশে-বিদেশের প্রায় সব সংগীত প্রতিভা অন্বেষণ প্রতিযোগিতার নিয়মিত দর্শক আমি। অনেক নতুন মুখ উঠে আসে এতে। নতুনদের এই উঠে আসাটাকে গুরুত্বপূর্ণই মনে হয় আমার। একই সঙ্গে মনে করি, তাদের যত্ন করে শেখানোটাও জরুরি। কিন্তু শেখাবেটা কে? আমাদের দেশে ভালো শিক্ষকের অভাব আছে। অনেক মা-বাবা শুধু কবে বাচ্চাকে টিভিতে গান গাইতে দেখবেন, এ অপেক্ষায় থাকেন। কিন্তু বাচ্চাটা তৈরি হোক, এটা ভাবেন না। আসলে কোনো শিক্ষারই চটজলদি কোনো রাস্তা নেই। একটা প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যেতে হয়। গান গেয়ে অন্তর ছুঁয়ে যেতে সবাই পারে না। কেউ কেউ পারে। গানটা কালোত্তীর্ণ হয় তখনই, যখন একজন শিল্পী গানের একদম ভেতরে ঢুকে যেতে পারে। গানের অর্থ বুঝে গানটা গায়। গানের মর্মটা না বুঝে সেটা গাইলে তখন তা আর গান হয় না। ভালো গান হবে তখনই, যখন অন্তরের দরদ মিশিয়ে শিল্পী গানটা গাইবে।

কেমন চলছে আব্বাসউদ্দীন সংগীত একাডেমী?

আমার অনেক স্বপ্ন আব্বাসউদ্দীন একাডেমী নিয়ে। আব্বাসউদ্দীন সংগীত একাডেমীর কোনো নিজস্ব ভবন নেই। এটা একটা বড় অসুবিধা। নিজেদের ভবন থাকলে আমি সাত দিন কিছু না কিছু করতে পারি। প্রতিদিন কাজের মধ্যে যায়। এখন বয়স হয়েছে। সব সময় শরীর ভালো থাকে না। তাই যখন একটু সুস্থ থাকি, তখন গানটা নিয়েই থাকতে চাই।

সবাই বলেন, ফেরদৌসী রহমানের সেই চিরচেনা মিষ্টি হাসিটা আজও থেকে গেছে আগের মতো…

অনেকেই বলে কথাটা। কিন্তু এটা তো ঠিক, চেহারায় বয়সের ছাপ একটু-আধটু পড়বেই। আর বয়সের কারণে আক্রান্ত হব নানা রোগবালাইয়ে। তবে এটা এ কারণে হতে পারে যে, আমি আমার হাসি এবং সাজসজ্জা সেই আগের মতো অবিকল রেখেছি। নিজেকে বদলানোর চেষ্টা করিনি কখনো। এ জন্য এ রকমটা মনে হতে পারে।

গান কি সেই আগের মতই টানে?

মেঘে মেঘে বেলা হয়েছে অনেক। প্রায় সকালেই আমার ফোনটা বেজে ওঠে। ফোনের ওপাশে থাকে প্রিয় নাতিদের কণ্ঠ। তারা বাংলাদেশে আসে মাঝেমধ্যে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী নাতিদের জন্য মনটা খুব আকুল থাকে। তার পরও নিজের কাজে মত্ত তো থাকতেই হয়। এখন আর আগের মতো সবকিছু পুরোপুরি সময়মতো সামলে উঠতে পারি না। ক্লান্তি এসে ভর করে কখনো কখনো। শরীর ও মনও বেঁকে বসে হঠাৎ হঠাৎ। তাই বলে থেমে থাকি না। আমি আমার গান চালিয়ে যাই। শত ব্যস্ততার মধ্যে এখনো নিয়মিত রেওয়াজ করি। সুযোগ পেলে বসে যাই হারমোনিয়ামটা নিয়ে। আকাশে খুব মেঘ করলে কিংবা খুব মন খারাপ হলে এখনো সেই আগের মতো সংগীতই আমার নিত্যসঙ্গী।

আপনার একটা আত্মজীবনী লেখার পরিকল্পনার কথা বলছিলেন।

হ্যাঁ, এমন একটা পরিকল্পনা আছে আমার। জীবনকাহিনীটা একফাঁকে লিখে ফেলতে চাই একটু একটু করে। সব মিলিয়ে মোটাসোঁটা একটা বই বের করার ইচ্ছে আছে। কোচবিহার আর বলরামপুরে ফেলে আসা শৈশবের গল্প। সেই ১৯৪৭ সালে ওপার থেকে এপারে পাড়ি জমানোর গল্প। বাবা আব্বাসউদ্দীনের কোলে বসে গান শোনার গল্প। গান শোনা আর গান গাওয়া শুরু করার গল্প। টিভি-রেডিও, দেশে-বিদেশে কত ঘটনাই তো আছে এই ছোট্ট জীবনে। আছে নানা বেদনা, প্রাপ্তি এবং সুখস্মৃতি। মানুষের অভাবনীয় ভালোবাসা ও মমতার গল্প। আদ্যোপান্ত জীবনটা আমার তুলে আনার ইচ্ছা সেই বইয়ে।