নানা আয়োজনের ঢাকা লিট ফেস্ট ২০১৭

বিশ্বায়নের অবারিত উদার উন্মুক্ত দ্বার স্বাগতম জানায় একে অন্যকে। অর্থ থেকে শুরু করে সাহিত্য-সংস্কৃতি সবক্ষেত্রেই চলে আদান প্রদান খেলা। এতে প্রভাবশালী পক্ষের রপ্তানি আর দুর্বল পক্ষের আমদানি বেশি ঘটে। আর এই আদান প্রদানের ভারসাম্য রাখতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানের উৎসব অনুষ্ঠান। ঢাকা লিট ফেস্ট তেমনই এক আদান প্রদানের লীলাভূমি, বিশ্বসাহিত্যের সমকালীন উল্লেখযোগ্যদের মিলনমেলা। লেখক পাঠক থেকে শুরু করে শিল্পী, গণমাধ্যম কর্মী, উন্নয়ন কর্মীদের মিলিত হওয়া চমৎকার এক প্ল্যাটফর্মও এ উৎসব।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এ সাহিত্য উৎসবের এবারের আসর বসেছিল গত ১৬ থেকে ১৯ নভেম্বর, বরাবরের মতোই বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে। এবার এ উৎসব উদ্বোধন করেন এই আয়োজনের প্রধান অতিথি সিরিয়া বংশোদ্ভূত কবি আদোনিস। সঙ্গে ছিলেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান, রাদোয়ান মুজিব সিদ্দিকী এবং উৎসবের তিন পরিচালক- কাজী আনিস আহমেদ, সাদাফ সাজ ও আহসান আকবর।

ঢাকা লিট ফেস্টের পঞ্চম আয়োজনে অংশ নেন ২৪ দেশের দুশোরও বেশি লেখক ও শিল্পী। উৎসবের তিন দিনে মোট ছয়টি মঞ্চে একাধারে চলে বিভিন্ন সভা, আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এছাড়াও বাংলা একাডেমির পুস্তক বিক্রয় কেন্দ্রের পাশাপাশি বইয়ের পশরা নিয়ে হাজির ছিলো বাংলাদেশের প্রথম সারির সব প্রকাশনা সংস্থা।

শিশুদের জন্য ছিলো পাপেট শো

এবছর সাহিত্যপ্রেমীদের জন্য সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিলো কবি আদোনিস। ৮৬ বছর বয়সী এই সাহিত্যিককে বলা হয় ফাদার অব মডার্ন অ্যারাবিক পোয়েট্রি। এছাড়াও অন্যতম আকর্ষণ ছিলেন বুকার জয়ী ঔপন্যাসিক বেন ওকরি, অস্কার জয়ী অভিনেত্রী টিল্ডা সুইনটন, লায়োনেল শ্রাইভার। বাংলাদেশের প্রধানতম সাহিত্যিকরাও ছিলেন উৎসবের অন্যতম আগ্রহ। অধ্যাপক কায়সার হক, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, সলিমুল্লাহ খান, কবি হেলাল হাফিজ ও আনিসুল হকরা আলোকিত করেছেন বিভিন্ন মঞ্চ। দুটি গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কারও প্রদান করা হয়েছে উৎসবে- জেমক সাহিত্য পুরস্কার ও ডিএসসি প্রাইজ ফর সাউথ এশিয়ান লিটারেচার। সাহিত্য সংশ্লিষ্ট আলোচনা হয়েছে যেমন তেমনি সমকালীন রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন আলোচনায় যোগ দেন দেশি বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যম ও উন্নয়ন কর্মীরা। একই সঙ্গে অন্যান্য মঞ্চে চলেছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনী। বাংলাদেশের সাহিত্য প্রেমীরা যেমন বিদেশি সাহিত্যিকদের দেখা পেয়েছে তেমনি বিদেশি অতিথিরাও দেখা পেয়েছে বাংলাদেশের বাউল সংগীত, মঞ্চনাটকের। শিশুদের জন্যও আলাদাভাবে আয়োজিত হয় বেশ কটি অনুষ্ঠান।

প্রতিদিনই শত শত মানুষের পদভারে মুখরিত ছিলো বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ। তবে একই সঙ্গে ছটি মঞ্চে বিভিন্ন অনুষ্ঠান চলায় সবার পক্ষে ইচ্ছা থাকলেও সবগুলো সেশনের অংশ নেবার সুযোগ ছিলো না। মাত্র তিন দিনের ব্যপ্তিই বোধহয় এর প্রধান কারণ। এদিকে উৎসবের জনপ্রিয় ধারণা অনুযায়ী মঞ্চ এবং বইয়ের দোকানের পাশাপাশি খাবারের দোকানেও ছিলো দেখার মতো ভিড়।

‘ডিএসসি প্রাইজ ফর সাউথ এশিয়ান লিটারেচার’ বিজয়ীর সঙ্গে সমাপনীর অতিথিবৃন্দ

ঢাকা লিট ফেস্টের উদ্দেশ্য বর্ণণা করতে গিয়ে এর পরিচালক কাজী আনিস আহমেদ বলছিলেন, ‘আমরা সাহিত্য ও শিল্পকে পৃষ্ঠপোষকতা করতে চাই। ভাষাভাষীর দিক থেকে বাংলা পৃথিবীর সপ্তম বৃহত্তম ভাষা। আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি রয়েছে। এই সংস্কৃতি আমাদের এতই ঘিরে রাখে যে আমরা অন্য দেশের সংস্কৃতির দিকে তাকানোর সুযোগ পাই না।’

উৎসবের শেষ দিনে এর সমাপ্তি ঘোষণা করেন বাংলাদেশের মাননীয় অর্থ মন্ত্রী জনাব আবুল মাল আব্দুল মুহিত। এর আগে ‘হে ফেস্টিভ্যাল’ এ বহুবার দাওয়াত পেলেও তিনি সেটিকে নিজের বলে ভাবতে পারেননি তিনি– তাই যাওয়া হয়নি। ঢাকা লিট ফেস্ট ঢাকার নিজস্ব অনুষ্ঠান তাই তিনি এখানে বার বার আসেন বলে জানান তিনি। পঞ্চমবারের ধারাবাহিকতায় এ উৎসব আরও আপন হয়ে উঠছে- সে আভাস পাওয়া গেল সমাপনীর প্রধান অতিথির কাছ থেকেও। তবে এর ফলে ভিনদেশি সাহিত্য-সংস্কৃতির দিকে তাকানো সুযোগ সৃষ্টি হবে কিনা এবং তাতে আদান প্রদানের ভারসাম্য রক্ষা হবে কিনা সে প্রশ্নের উত্তর অবশ্য অনুরাগী পাঠক সমাজই দেবে।