সর্বজনের ভালোবাসায় সিক্ত কবি

তিনি বহুমাত্রিক সৃজনশীলতা দিয়ে নানাভাবে সমৃদ্ধ করেছেন বাংলা সাহিত্যকে। সাহিত্যের বিস্তৃত অঙ্গনে তাঁর অবদানের কারণে সব্যসাচী লেখক হিসেবেই সমধিক সম্বোধিত। সৈয়দ শামসুল হক (১৯৩৫-২০১৬) সম্মানিত হয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানতম সম্মাননায়। গত ২৭ সেপ্টেম্বর তিনি চির বিদায় নেন। গত ৯ অক্টোবর প্রয়াত এই লেখকের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আয়োজন করা হয় একটি স্মরণসভার।

এ স্মরণসভায় সভাপতিত্ব করেন এমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের এমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী।

আয়োজনের শুরুতে সৈয়দ শামসুল হক স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এরপর প্রয়াত লেখকের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের শিক্ষার্থীরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দুটি সম্মেলক সংগীত পরিবেশন করেন। ‘তোমার অসীমে প্রাণমন লয়ে যত দূরে আমি ধাই’ গানটি দিয়ে শুরু করেন সম্মেলক দল। পরের গানটি ছিল, ‘জীবন-মরণের সীমানা ছাড়ায়ে’। বেঙ্গল ফাউন্ডেশনে বিভিন্ন সময়ে কবিতাপাঠ নিয়ে নির্মিত জলেশ্বরীর কথক নামে একটি তথ্যচিত্রও প্রদর্শন করা হয় অনুষ্ঠানের শুরুতে।

প্রধান অতিথির বক্তৃতায় অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘সৈয়দ শামসুল হকের মূল পরিচয় সাহিত্যিক হিসাবে।’ প্রতিভাবান এই সাহিত্যিকের জীবনাচরণের বর্ণনা করেন তিনি। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী আরও বলেন, ‘সৈয়দ হকের প্রতিভা যা কিছুকে স্পর্শ করেছে, তাকেই সজীব করেছে। তবে প্রতিভার সাথে সাহিত্যচর্চায় নিরলস পরিশ্রম তাঁকে দেশের অন্যতম সাহিত্যিকে পরিণত করেছে।’

সভাপতির বক্তব্যে ড. আনিসুজ্জামান বলেন, ‘সৈয়দ শামসুল হকের সাহিত্যচর্চার ব্যাপ্তি ছয় দশকের অধিক ছিল। এই পুরো সময়টায় সমতল থেকে অসাধারণ উচ্চতায় আরোহণ করতে পেরেছিলেন। তিনি নিরন্তর নিজেকে পরিবর্তন করেছেন। নতুন বিষয় নিয়ে চিন্তা করেছেন, ভাষা প্রয়োগে নতুনত্বের কথা ভেবেছেন। তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক অবস্থাকে তাঁর রচনার সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। এই রাজনৈতিক, সামাজিক সচেতনতা থেকে তিনি কখনো সরে দাঁড়াননি।’

সব্যসাচী এই লেখকের জীবনের বিভিন্ন দিকে আলোকপাত করেন বিশিষ্টজনেরা। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান জনাব আবুল খায়ের। কবি ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে অনেক স্মৃতি আর ঘনিষ্ঠতার কথা তুলে ধরেন তিনি। ১৯৯০ সালে সৈয়দ হক ও কলিম শরাফীর হাত ধরেই সূচনা হয় বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের। এমনকি বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের বর্তমান লোগোর নকশাটাও তিনি করেছিলেন বলে জানান জনাব আবুল খায়ের। তিনি বলেন, ‘শামসুল হক ছিলেন বন্ধু ও অভিভাবকের মতো, কিছু মানুষ কোনো দিন মরে না, সে রকম একজন মানুষ হক ভাই। তিনি আমাদের ভিতর আছেন এবং চিরদিন থাকবেন।’

কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন বলেন, ‘সাতচল্লিশ-পরবর্তী বাংলা সাহিত্যের যে ধারা বাংলাদেশে বহমান, যে কয়জন সেই সময়ে ধারাটির সূচনা করেছিলেন, হক ভাই ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম।’ তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন লেখক তাঁদের শক্তি ও শিল্পগুণের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছেন, কিন্তু সাহিত্যের যে একটি স্রোতোধারা থাকে, যে স্রোতোধারায় একটি জাতির মানস গঠনের দিক নির্ধারণ করে, সেই স্রোতোধারার অন্যতম লেখক সৈয়দ শামসুল হক।

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব লেখক মফিদুল হক বলেন, ‘আমার অনেক ব্যক্তিগত ঋণ স্বীকার করবার আছে হক ভাইয়ের কাছে। জীবনের চলার পথে তাঁর সান্নিধ্য অনেক সমৃদ্ধ করেছে আমাকে। স্বাধীনতা আন্দোলনের সূত্রে গাঁথা ছিল তাঁর লেখনী, সে সময় পূর্ব বাংলায় স্বাধীনতাকামী মনোভাব গড়ে তোলায় তাঁর ভূমিকা ছিল অসামান্য। হক ভাই আমাদের সদগুরু ছিলেন, আমরা ছিলাম তাঁর স্নেহ ভালোবাসায় সিক্ত।’
স্মরণসভায় উপস্থিত ছিলেন কবিপুত্র দ্বিতীয় সৈয়দ-হক। তিনি উল্লেখ করলেন, বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের সঙ্গে তাঁর বাবা ও পরিবারের একটি দীর্ঘ সময়ের সম্পর্কের কথা। বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন তিনি।

এ ছাড়া বক্তব্য দেন নাট্যজন আলী যাকের। তিনি বললেন মঞ্চনাটক নির্মাণে সৈয়দ হকের ভূমিকার কথা। নাটকের সংলাপে তাঁর অসাধারণ উপমার কথা উল্লেখ করেন তিনি। নূরলদীনের সারাজীবন থেকে পাঠ করেও শোনান তিনি।

সৈয়দ শামসুল হক তাঁর শেষ জন্মদিনে দেওয়া বক্তৃতার অংশবিশেষ ‘দৃষ্টি ভূমিতে দীর্ঘ ছায়া’ ও ‘পরানের গহীন ভিতর’ শীর্ষক কবিতা পাঠ করেন হাসান আরিফ। অভিনয়শিল্পী ত্রপা মজুমদারপায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় থেকে আবৃত্তি করেন একটি লম্বা সংলাপ।

মৃত্যুর আগ পর্যন্ত হাসপাতালের বিছানায় যিনি সাহিত্য রচনা থেকে বিরত থাকেননি, তাঁকে এ দেশ এ ভাষার মানুষ কীভাবে ভুলবে। জীবন-মৃত্যুর ভেদরেখা মুছে দিয়ে অমর হয়ে রইবেন তিনি।