সাদা-কালো ফ্রেমে বর্ণিল জীবনের উপাখ্যান

এস এম সুলতান। বাংলাদেশের শিল্পচর্চার ইতিহাসে অন্যতম পথিকৃৎ। তাঁর নাম শুনলেই মানসপটে যে ছবি ভেসে ওঠে সেটি একটি পোট্রেট আলোকচিত্র। আর আলোকচিত্রের আলোছায়ায় এই গুণী শিল্পীর প্রতিকৃতি ফুটিয়ে তুলেছেন আরেকজন গুণী আলোকচিত্রী- নাসির আলী মামুন। শুধু সুলতান নয়, তার ক্যামেরায় কবিতা হয়ে ফুটে উঠেছে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অনেক সংখ্যক গুণী মানুষের ছবি। গতকাল ১০ এপ্রিল বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী গ্যালারিতে শুরু হয়েছে এই চিত্রীর ৫৭ তম একক আলোকচিত্র প্রদর্শনী ‘ফটোজিয়াম’। চব্বিশ দিনব্যাপী এ প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন এমিরেটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান।

প্রদর্শনীতে মোট ১৩০টি সাদাকালো পোর্ট্রেট আলোকচিত্র স্থান পেয়েছে। সাদা-কালো এসব ছবিতে আছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, জননেতা আবদুল হামিদ খান ভাসানীসহ অসাধারণ সব মানুষের মুখচ্ছবি। বিদেশের বহু খ্যাতিমানের প্রতিকৃতিও ফ্রেমবন্দী করেছেন তিনি। মাদার তেরেসা, বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, বারাক ওবামাসহ আছেন গুন্টার গ্রাস, গিরিজা দেবীর মতো প্রখ্যাত শিল্পী। স্বাধীনতার পূর্বে কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই আলোকচিত্র গ্রহণ শুরু করেন তিনি। ছিলো না নিজের ক্যামেরা। মাত্র দুই কি তিন ঘণ্টার জন্য ভাড়া নিয়ে ছুটে বেড়িয়েছেন গুণীজনদের প্রতিকৃতি ফ্রেমবন্দী করতে। মূলত ১৯৭২ সালের পর শুরু করলেন ‘পোর্ট্রেট ফটোগ্রাফি’। খ্যাতিমানদের স্টুডিওতে তোলা ছবি দেখে তুষ্ট না হয়ে নিজেই নেমে পড়েন তাদের সত্যিকার প্রতিকৃতি তুলে ধরার। যেখানে মানুষের মুখের স্থাপত্য ধরা পড়ে। ক্যামেরার কবি নামে খ্যাত এই আলোকচিত্রী বর্তমানে ‘ফটোজিয়াম’ নামে বাংলাদেশে একটি আলোকচিত্রের জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করতে উদ্যোগী হয়েছেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী জনাব আসাদুজ্জামান নূর, এমপি। সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দৈনিক প্রথম আলোর সম্পাদক জনাব মতিউর রহমান এবং বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান জনাব আবুল খায়ের। অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক জনাব ফয়জুল লতিফ চৌধুরী।

উদ্বোধনকালে অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান বলেন, ‘সাদা-কালো ছবির প্রধান দেখার বিষয় হচ্ছে আলো ও ছায়ার খেলা। রঙিন ছবির চাইতে সেগুলোর স্থায়িত্বও বেশি। আসল কথা হচ্ছে যার প্রতিকৃতি তোলা হচ্ছে, তাঁর চরিত্র ফুটিয়ে তোলা শিল্পীর চোখ ও হাতের দক্ষতার ব্যাপার। মামুনের ছবির সার্থকতা হচ্ছে, সব ছবিতেই তিনি ছবির মানুষটির ব্যক্তিত্ব ও বৈশিষ্ট্য বাস্তব করে তুলেছেন।’

প্রদর্শনীটি উৎসর্গ করা হয়েছে জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক-কে।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বলেন, ‘মামুনের মতো এমন মানুষগুলো আছেন বলেই পৃথিবী সুন্দর। যে মানুষ ছবি আঁকেন, কবিতা লেখেন, সাহিত্য রচনা করেন, সেই মানুষগুলোর সবার মধ্যেই কমবেশি পাগলামি আছে। তাঁরা আছেন বলেই পৃথিবীতে নতুন কিছু সৃষ্টি হয়, আমরা সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারি এবং পৃথিবী সুন্দর হয়ে উঠবে- সে রকম একটি আশাবাদ নিয়ে বেঁচে থাকি।’

মতিউর রহমান বলেন, ‘মামুন ছবি তোলে প্রায় ৫০ বছর। এই তথ্যটি আমাদের কাছে একটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কেউ যখন একটি বিশেষ বিষয়ে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে থাকেন, তখন তা একটি অন্য মাত্রা পায়। এই প্রদর্শনীতে আমরা বাংলাদেশের সেরা শিল্পী-কবি-গায়ক-লেখক-চিন্তাবিদ এবং বাংলাদেশের বাইরে ভারত ও বিশ্বব্যাপী সেরা ব্যক্তিদের ছবি দেখতে পাব।’

আবুল খায়ের বলেন, ‘প্রদর্শনীটি দেখে বিস্মিত হয়েছি। ছবি সাজানো একটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস। সাধারণ ছবিও সাজানোর গুণে অসাধারণ হয়ে ওঠে। যিনি এই কাজটি করছেন, তাঁর যদি বুদ্ধিমত্তা থাকে, তিনি যদি জানেন কীভাবে কাজটি করতে হয়, তাহলে সেটা ভালো হয়। এ দিকটিতে নজর দেওয়ার জন্য আয়োজকদের ধন্যবাদ।’ এসময় তিনি বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ‘বেঙ্গল মিউজিয়াম’ নামে একটি জাদুঘর স্থাপনের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘এই জাদুঘরে শিল্পকর্ম, কারুশিল্প, স্থাপত্যকর্ম এবং ছবির গ্যালারিও থাকবে।’

আর্টকন-এর সার্বিক সহযোগিতায় আয়োজিত নাসির আলী মামুন-এর প্রদর্শনীটি জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক-কে উৎসর্গ করা হয়েছে। এটি চলবে চলবে আগামী ৩ মে পর্যন্ত। প্রতি শনিবার থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ১০:৩০টা থেকে রাত ৮:০০টা এবং শুক্রবার দুপুর ২:৩০টা থেকে রাত ৮:৩০ পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে ‘ফটোজিয়াম’।