সিক্ত পুষ্পের সুবাস

প্রকৃতির পালা পরিবর্তনে সবচেয়ে সংবেদনশীল অনুষঙ্গ বৃক্ষ। বর্ষায় প্রকৃতির সতেজ সবুজকে বরণ করে নিতে রং আর সৌরভের পশরা সাজায় কদম, কেয়া, জারুল (বর্ষা জারুল), ফুরুস, কুরচি, কামিনী, হাসনাহেনা, রজনীগন্ধা, মধুমঞ্জরী, দোলনচাঁপা, অগ্নিশিখা, নানা রঙের রঙ্গন, টগর, রক্তজবা, শ্বেতকাঞ্চন । বনে জঙ্গলে আকাশে রং ছড়ায় সেগুন, গগণশিরীষ, নাগলিঙ্গম, চালতা। গ্রীষ্মের উত্তাপ উপেক্ষা করে থেকে যায় কৃষ্ণচূড়া, সোনাইল, কাঠগোলাপ, গন্ধরাজ, বেলী, জুঁই, চামেলী।

 

বর্ষার জনপ্রিয়তম ফুল কদম। কদম্ব কিংবা নীপ নামেও সমধিক পরিচিত।

কদম আষাড়ের ফুল। এক বলা হয় বর্ষার দূত। শহর এভিনিউতে ছায়াতরু হিসাবেও কদম অনন্য। পত্রমোচী এ বৃক্ষের হলুদ গোলাকার পুষ্পাধারে অজস্র সাদা ফুলের রেণু, যার গন্ধ বর্ষার জলে ভিজে মানব মনকে রোমাঞ্চিত করে। তবে ফুলের স্থায়ীত্ব তিন থেকে চারদিন। আর যখন ফোটে সব ফুল এক সঙ্গে ফুটে ওঠে। তবে কয়েকবার ফুল আসে কদম গাছে।

 

কেতকী প্রস্ফুটিত হয় শ্রাবণে। ছবি: গুগল

বহু শাখা-প্রশাখা ও পাতায় ভরা চিরসবুজ ভিন্নবাসী (স্ত্রী ও পুরুষ ফুল ভিন্ন গাছে হয়) উদ্ভিদ কেয়া, যার পাতার ধারগুলি করাতের মত। অনেকগুলি গাছ একত্রে কেয়াঝোপ বা কেয়াবন তৈরী করে। একটি গাছ পুষ্পিত হতে সময় লাগে প্রায় ২৫ বছর।

 

বৈশাখের শুরুতে আসলেও বর্ষা অব্দি রয়ে যায় বেগুনী রঙের জারুল

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে যখন জারুলে ফুল আসে, তখন গাছের সবুজ হারিয়ে যায় বেগুনী ফুলে আর পর পর গাছগুলি তৈরী করে সবুজ ক্যানভাসে বেগুনীর আলপনা। জারুলের খুব কাছাকাছি প্রজাতি ফুরুস বর্ষা এলে ডালের আগায় ছোট ছোট ফুলের থোকায় ভরে ওঠে গাছ। সাদা, গোলাপী, লাল, বেগুনি রঙের কয়েকটি প্রজাতি পাওয়া যায় আমাদের দেশে। এয়ারপোর্ট রোডের দু’পাশে ছাড়াও ঢাকার অনেক সড়কদ্বীপে একে দেখা যায়।

বিরল প্রজাতির বর্ষা জারুল

জারুলের আরেকটি প্রজাতি বিলাতি জারুল বা বর্ষা জারুল। বর্ষাকালে ফোটে বলে একে বর্ষা জারুলও বলা হয়। এ ফুল প্রথমে বেগুনী, পরে ধীরে ধীরে সাদা হয়। এজন্য বর্ষা জারুলের একই বৃন্তে সাদা আর বেগুনি ফুল দেখা যায়। গাছটি আমাদের দেশে জারুলের মত এত দেখা যায়না। ঢাকাতে রমনা পার্কের ভিতর বর্ষা জারুলের একটি বীথি চোখে পড়ে।

সুরভিত আরেক ফুল কাঠগোলাপ

মাঝারি আকারের পত্রমোচী এই গাছকে অনেকে গোলকচাঁপা কিংবা গোলাচি বলে থাকে। গ্রীষ্ম থেকে বর্ষা গাছটি সুরভী ফুলে ভরে থাকে।

 

গ্রীষ্মে ফুল চলে আসলেও সারা বর্ষা গন্ধ ছড়ায় কামিনী

রাতে সারা গাছ সাদা লেবুগন্ধে ভরে ওঠে কিন্তু ভোর হতেই ঝরে যায়। কবির কলমে, “দূর হতে দেখিবার, ছুঁইবার নয় সে”। সামান্য স্পর্শে সে ঝরঝর করে ঝরে পড়ে।

 

রূপে গুণে কম নয় চালতা ফুল

চালতা, নামটি শুনলেই আমাদের জিহবায় জল চলে আসে। একে আমরা ফল হিসাবেই চিনি। কিন্তু এর ফুলের সৌন্দর্য যে কোন নিসর্গীকে পাগল করবে। অথচ সাদা পাপড়ির মৃদু সৌরভের ফুলটি আজও ফুলের মর্যাদা পেল না।

 

মধুমঞ্জরীর থোকা

মধুমঞ্জরী,  হাসনাহেনা, দোলনচাঁপা ফোটে সন্ধ্যায়, সারারাত সে গন্ধ বিলায়। অনেকে মাধবীলতা আর মধুমঞ্জরীকে গুলিয়ে ফেলেন। মাধবীলতা বাংলাদেশ ও ভারতের প্রজাতি। বসন্তে সপ্তাহ দু’য়েকের জন্য লতাটি সাদা ফুলের সৌরভে ভরে ওঠে। আর মধুমঞ্জরী মালয়েশীয় প্রজাতি, কাষ্ঠল লতা। গ্রীষ্ম ও বর্ষায় ঝুলন্ত থোকায় সাদা ও লাল রঙের ফুল ফুঠে সন্ধ্যায়। সাধারণত অনেক বাড়ীর প্রবেশপথে দেখা যায় এর তোরণ। রবি ঠাকুর ‘বনবাণী’ কাব্যগ্রন্থে মধুমঞ্জরীকে নিয়ে একটি কবিতা লেখেন এবং সেখানেই তিনি এই বিদেশি লতার নামকরণ করেন ‘মধুমঞ্জরী’। অন্যদিকে মাধবীলতা দুর্লভ, রমনা পার্কে কয়েকটি গাছ আছে মাত্র।

 

আগুনের শিখার মত দেখতে হয় উলট-চণ্ডাল

কোঁচকানো পাপড়িগুলি উর্ধ্বমুখী আর পুংকেশরগুলি নিচে এই ফুলের। ফুলার রোডে ব্রিটিশ কাউন্সিল, কার্জন হলের সামনে এবং বোটানিক্যাল গার্ডেনও দেখা যায় এ ফুল। এমন চমৎকার ফুলটির এমন উদ্ভট নাম রবি ঠাকুরের পছন্দ হয়নি, তাই তিনি নাম রাখেন- অগ্নিশিখা। এভাবে তিনি যেখানেই নতুন কোন ফুল দেখেছেন, আকৃষ্ট হয়ে নিয়ে এসেছেন শান্তিনিকেতনে। অনেক বিদেশি ফুলকে নতুন নামে বরণ করে নিয়েছেন।

বর্ষার কালো মেঘ কেটে গিয়ে শরৎ আসে। কিন্তু মানব মনে বর্ষা যে আচঁড় কাটে, তা কি যায় সহজে? রয়ে যায় স্মৃতিতে, পুরানো গান ও কবিতার চরণে চরণে। প্রাণে বাজে রবীন্দ্রনাথ কারনে অকারনে-

আজি বরিষনমুখরিত শ্রাবণরাতি,

স্মৃতিবেদনার মালা একেলা গাঁথি।

 

 ছবি: লেখক

তথ্য সূত্র:

০১. ফুলগুলি যেন কথা-দ্বিজেন শর্মা

০২. শ্যামলী নিসর্গ- দ্বিজেন শর্মা

০৩. রবীন্দ্রসঙ্গীতে উদ্ভিদ ও ফুল-দেবী প্রসাদ মুখোপাধ্যায়।

০৪. www.tagoreweb.com