সুবীর চৌধুরী শিল্পচর্চা বৃত্তি ২০১৫ অর্জনকারী দুই শিল্পীর শিল্পকর্ম নিয়ে ওপেন স্টুডিও

সেপ্টেম্বরের দীর্ঘ বিকেল যেন শেষই হচ্ছিল না। অধীর অপেক্ষায় আছেন বেশ কজন মানুষ। ধানমন্ডির জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক বিদ্যাপীঠে চলছে প্রস্তুতি। দুই নবীন শিল্পীর শিল্পকর্ম প্রত্যক্ষ করতে উদ্গ্রীব সবাই। বিকেল গড়িয়ে আসতেই আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনপর্ব শুরু হলো। শিল্পী ও অতিথিদের পরিচয় করিয়ে দিলেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী। একে একে আসন গ্রহণ করলেন শিল্পী শহিদ কবির, বেঙ্গল ইনস্টিটিউট ফর আর্কিটেকচার, ল্যান্ডস্কেপ অ্যান্ড সেটেলমেন্টের মহাপরিচালক অধ্যাপক কাজী খালিদ আশরাফসহ অন্য অতিথিবৃন্দ। যাঁদের নিয়ে এই আয়োজন, শিল্পী ঈশিতা মিত্র তন্বী এবং শিল্পী আবীর সোম- ঠিক এক বছর আগে অর্জন করেছেন সুবীর চৌধুরী শিল্পচর্চা বৃত্তি। তাঁদের নির্বাচিত শিল্পকর্ম নিয়ে একটি ওপেন স্টুডিওর আয়োজন করা হয়েছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর শুক্রবার সন্ধ্যায় জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক বিদ্যাপীঠে প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন অতিথিগণ।
তরুণ ও উদীয়মান শিল্পীদের চর্চা এবং সাধনায় মাত্রা সঞ্চারের উদ্দেশ্যে ২০১৫ থেকে সুবীর চৌধুরী শিল্পচর্চা বৃত্তি (Subir Choudhury Practice Grant) প্রবর্তন করেছে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন। বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের অন্যতম ট্রাস্টি, বেঙ্গল গ্যালারি অব ফাইন আর্টসের পরিচালক প্রয়াত সুবীর চৌধুরীর সম্মানে এই বৃত্তি প্রবর্তন করা হয়। সুবীর চৌধুরী শিল্পচর্চা বৃত্তি শিল্পের সেবক হিসেবে সুবীর চৌধুরীর অনুসরণীয় জীবন ও কর্মকে সম্মানিত করবে এবং প্রতিশ্রুতিশীল ও উদীয়মান শিল্পীদের একটি স্বতন্ত্র ও মৌলিক শিল্পচর্চার ধারা প্রতিষ্ঠায় মুখ্য ভূমিকা রাখবে- এই ভাবনা থেকেই প্রবর্তন করা হয়েছে এই বৃত্তির।
গত বছর বৃত্তিপ্রাপ্ত শিল্পীদের সম্মাননা দেওয়া হয় এবং এ বছর তাঁদের নির্বাচিত শিল্পকর্ম নিয়ে আয়োজন করা হয়েছে এই ‘ওপেন স্টুডিও’র। প্রদর্শিত শিল্পকর্মে প্রকাশ পেয়েছে তরুণদের সমসাময়িক শিল্পভাবনা। ভাস্কর্য, মিশ্র মাধ্যম, চিত্রকলা ও বিভিন্ন ইনস্টলেশনের মাধ্যমে শিল্পভাবনার ছাপ ফুটিয়ে তোলেন এই তরুণ শিল্পীদ্বয়। সময় এবং সময়ের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় ধাবমান জীবনের গল্প আবীরের শিল্পচর্চাকে প্রভাবিত করে। লাল রঙের অধিক ব্যবহার রূঢ় সময়ের পঙ্কিল বাস্তবতাকে আমাদের সম্মুখে টেনে নিয়ে আসে। একই সঙ্গে তিনি একটি কাল্পনিক রাজ্য নির্মাণেও প্রয়াসী হন, যেখানে এই পৃথিবীর অতি বিচিত্র আর জটিল চরিত্রগুলো নরকের বাস্তবতায় এক মোহনীয় সুখে বিভোর হয়ে থাকে। এই চরিত্রগুলো আবার একই সঙ্গে একেক ধরনের বিচ্ছিন্ন জৈব অনুভ‚তির ধারক হয়ে, অচেতন মানসিক বৈকল্যের শিকার হয়। আবার ঈশিতার কাজে আমাদের যাপিত জীবনের যন্ত্রণা, অপ্রাপ্তি আর অস্থিরতা আছে কিন্তু একই সঙ্গে এই অস্থিরতা আর অপ্রাপ্তি থেকে স্থিতি ও প্রাপ্তি অন্বেষণের এবং অসুরের শীতলতা থেকে সুরের কোমলতা খোঁজার আহহ্বানও আছে। বিচিত্র ধরনের বস্তুর সম্মিলনে একটি নতুন অবয়ব সৃষ্টি করেন তিনি, যা একটি নতুন শিল্পভাষার প্রস্তাব নিয়ে আসে আমাদের সম্মুখে।

উল্লেখ্য, সুবীর চৌধুরী (১৯৫৩-২০১৪) বাংলাদেশের অন্যতম এক শিল্পসংগঠকের নাম। প্রায় চার দশকের কর্মজীবনে বাংলাদেশের চারুকলা চর্চা ও এর বিস্তারে নব প্রাণশক্তির উন্মেষ এবং শিল্পীদের জন্য দেশে-বিদেশে নানাবিধ সুযোগ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে তিনি ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। শিল্পীদের জন্য তাঁর সহমর্মিতা ও আনুক‚ল্য সুস্পষ্ট হয় যখন তিনি ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির চারুকলা বিভাগে সহকারী পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন। ২০০৪ সালে তিনি বেঙ্গল গ্যালারি অব ফাইন আর্টসের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তখন থেকে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত বেঙ্গল গ্যালারির পরিচালক এবং বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের ট্রাস্টি হিসেবে বাংলাদেশের শিল্পীদের শিল্পচর্চায় সহযোগিতার বহুবিধ উপায় সন্ধানে নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছিলেন তিনি। শিল্পীদের বৃত্তি প্রদান, দেশ-বিদেশে চিত্র-প্রদর্শনীর আয়োজন, ক্যাটালগ এবং শিল্পকলাবিষয়ক বিভিন্ন প্রকাশনার উদ্যোগ গ্রহণ করা, দেশি-বিদেশি শিল্পীদের অংশগ্রহণে আর্ট ক্যাম্প আয়োজন, শিল্পীদের জীবন ও কর্ম নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ, শিল্পবিষয়ক সংলাপ আয়োজনসহ বহুবিধ কর্মে সর্বদা নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। সর্বোপরি শিল্পী, শিল্পবোদ্ধা, লেখক, সহায়ক প্রতিষ্ঠান ও শিল্পের স্বজনদের সমন্বয়ে একটি শিল্পবলয় গড়ে তুলেছিলেন তিনি।

আবীর সোম
১৯৮৮ সালে ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ড্রইং অ্যান্ড পেইন্টিং বিভাগ থেকে তিনি বিএফএ ডিগ্রি লাভ করেন। ২০১৫ সালে তিনি ইন ঢাকা অর দ্য লাস্ট ডে’স অব সডোম নামে একটি বই প্রকাশ করেন। তিনি ২০১১ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত ঙএঈঔগ ধৎঃ নামে একটি শিল্প-উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ড্রইং, লেখা, ভিডিও এবং ইন্টারনেটভিত্তিক কাজ তাঁর শিল্পচর্চার অন্যতম অনুষঙ্গ। ব্যক্তি আবীর এবং শিল্পী আবীরের মধ্যে জীবনবোধ নিয়ে যে ক্রমিক দ্বন্দ্ব মুখর সংলাপ চলমান, আবীরের শিল্পকর্ম আমাদেরকে তারই মুখোমুখি করে।

ঈশিতা মিত্র তন্বী
১৯৮৯ সালে জামালপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ছাপচিত্র বিভাগ থেকে এমএফএ ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি ২০১২ সালে OGCJM art-এর উদ্যোগে আয়োজিত এবং শিল্পী রফিকুল শুভর কিউরেট করা একটি দলবদ্ধ প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেন, যেখানে তিনি একটি দলের অন্তর্ভুক্ত হয়ে নিজেকে এবং নিজের পারিপার্শ্বিকতাকে অনুসন্ধানের প্রয়াস চালান। ঈশিতা একজন প্রক্রিয়াভিত্তিক শিল্পী, যিনি শিল্প সৃষ্টির দীর্ঘ যাত্রাকে বোঝা, অধ্যয়ন, অনুসন্ধান, আলোচনা ও উপস্থাপনা- এ রকম বেশ কিছু পর্যায়ের মাধ্যমে চূড়ান্ত রূপ দেন। কুড়িয়ে পাওয়া বিভিন্ন বস্তু তাঁর শিল্পচর্চার অন্যতম সহায়ক।