সুরের আবেশে

লন্ডনের রয়্যাল অ্যালবার্ট হল। বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত শিল্পীরা উন্মুখ হয়ে থাকেন এই হলে অনুষ্ঠান পরিবেশনের জন্য। খ্যাতিমান সেই হলেই আয়োজিত হয় ‘আ ক্ল্যাসিক্যাল ওডিসি : আ ট্রিবিউট টু মায়েস্ত্রো রবিশঙ্কর’ শীর্ষক শাস্ত্রীয় সংগীতের আসর। পাঁচ ঘণ্টার এই আয়োজনের ব্যাপ্তি ছিল বিশাল। গত ২২ মে অনুষ্ঠিত হয় শাস্ত্রীয় সংগীত ও বাংলা গানের এই আসর। এ রকম অভিজাত হলে বাংলাদেশের কোনো প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রমবারের মতো এ ধরনের আয়োজন করে ব্লুজ কমিউনিকেশনস। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অভিযাত্রায় এ হয়ে উঠেছে এক বিরল সৌভাগ্য।
একদিকে মঞ্চ রেখে গোলাকার বিশাল এই মিলনায়তনের তিন দিক জুড়ে দর্শকসারি। মঞ্চের ওপরে বড় পর্দায় সরাসরি অনুষ্ঠান দেখার ব্যবস্থাও ছিল। ১৩৫ ফুট উচ্চতার সুবিশাল এই মিলনায়তনজুড়ে দর্শকের কমতি ছিল না। এই বিপুল দর্শক সমাগম দেখে প্রতীয়মান শাস্ত্রীয় সংগীত শুধু ভারতবর্ষে নয়, পাশ্চাত্যেও এক অনন্য আসন অর্জন করেছে।
ঘড়িতে যখন সময় সন্ধ্যা ৬টা, মঞ্চের উজ্জ্বল আলো ছাড়া সমগ্র গ্যালারি অন্ধকারাচ্ছন্ন। শুরুতে মঞ্চে আসেন বাঁশির সুরে বিশ্বজয় করা পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া এবং বিখ্যাত সন্তুরবাদক পণ্ডিত শিবকুমার শর্মা। তাঁদের সুরে দর্শকদের মুগ্ধতা জানান দিচ্ছিল হলের পিনপতন নীরবতা। চৌরাসিয়ার বাঁশি এবং পণ্ডিত শিবকুমার শর্মার ৭২ তারের সন্তুরের সঙ্গে যোগ দেয় ঢোল ও তবলা।
এরপর বাংলার একান্ত আপন পঞ্চকবির গান উপস্থাপন করেন বাংলাদেশের শিল্পী লুভা নাহিদ চৌধুরী। ডি এল রায়ের ‘আমি সারা সকালটি বসে বসে’ দিয়ে শুরু করে একে একে পরিবেশন করেন অতুলপ্রসাদ সেন, কাজী নজরুল ইসলাম ও রজনীকান্ত সেনের গান। এই তিন কবি বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনকে নানাভাবে ঋদ্ধ করছেন। তাঁদের গানের বাণী ও সুরের বৈচিত্র্য লুভা নাহিদ চৌধুরীর কণ্ঠ লাবণ্যে নবীন মাত্রা নিয়ে অর্থময় হয়ে উঠেছিল। শুধু ভারতীয় যন্ত্র নয়, কণ্ঠসংগীতও যে দূরদেশের দর্শক-শ্রোতাদের বিমোহিত করতে পারে, তা হলভর্তি দর্শকদের উচ্ছ্বাসই জানান দিয়েছে।
পরে সেতার নিয়ে মঞ্চে হাজির হন পণ্ডিত রবিশঙ্করের মেয়ে আনুশকা শঙ্কর। সঙ্গে ঢোল, তবলা ও বাঁশির সংগত। আশির দশকে বাবা রবিশঙ্করের করা কম্পোজিশন দিয়ে শুরু করেন তিনি। প্রায় এক ঘণ্টা মনপ্রাণ উজাড় করে বাজান তিনি।


আনুশকার পর রবীন্দ্রসংগীত উপস্থাপন করেন স্বনামধন্য শিল্পী অদিতি মহসিন। গাইলেন কয়েকটি গান। প্রতিটি গান পরিবেশনের আগে তিনি ইংরেজিতে অনুবাদ করে বুঝিয়ে দেন গানের প্রেক্ষাপট। রবীন্দ্রনাথের গানের বাণী ও সুরে নিমজ্জিত হয়ে শ্রোতারা রাবীন্দ্রিক ধ্যান ও অনুধ্যানে পেয়ে যান ভিন্ন এক জগৎ। যে ভুবন শাশ্বত ও মানবিক বোধের প্রকাশে উজ্জ্বল।
বাংলাদেশের শিল্পীদের সঙ্গে ছিলেন দেশের কৃতী তবলাবাদক ইফতেখার আলম প্রধান (ডলার) ও কি-বোর্ড বাদক বিনোদ রায়।
এই আয়োজনের সর্বশেষ আকর্ষণ ছিলেন ভারতের বেহালাসম্রাট খ্যাতনামা ড. এল সুব্রমানিয়ম। কর্ণাটকি ঘরানার এই বেহালাবাদকের সঙ্গে মৃদঙ্গম, মর্সিং, ঘাটম-এর মিশেলে তৈরি অনন্য রাগ দর্শকদের আলোড়িত করে। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সমর্থন আদায়ে পণ্ডিত রবিশঙ্করের অবদানের কথা তুলে ধরা হয় একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য প্রামাণ্যচিত্রের মধ্য দিয়ে। উপস্থাপক বলেন, রবিশঙ্কর রয়্যাল অ্যালবার্ট হলে ১৭ বার পরিবেশনায় অংশ নিয়েছেন। তাঁর সর্বশেষ পরিবেশনা ছিল ২০০৫ সালে। অনুষ্ঠানে ব্লুজ কমিউনিকেশনসের উপদেষ্টা আবুল খায়ের বলেন, ‘পণ্ডিত রবিশঙ্করের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে রয়্যাল অ্যালবার্ট হলে বাংলাদেশি একটি প্রতিষ্ঠানের আয়োজন গর্বের ব্যাপার।’ বাংলা গান ও উচ্চাঙ্গসংগীতকে ছড়িয়ে দিতে এমন আয়োজন অব্যাহত রাখার প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তিনি। অনুষ্ঠানে স্মারক হিসেবে ব্লুজ কমিউনিকেশনসের পক্ষ থেকে শিল্পীদের উত্তরীয় পরিয়ে দেন আবুল খায়ের, প্রতিষ্ঠানটির পরামর্শক ড. এ কে আব্দুল মোমেন, যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার আবদুল হান্নান, কনসার্টের মিডিয়া পার্টনার চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর ও ব্লুজ কমিউনিকেশনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরহাদুল ইসলাম। ক্রেস্ট তুলে দেওয়া হয় পণ্ডিত রবিশঙ্করের স্ত্রী সুকন্যা শঙ্করের হাতে।

ভক্তি, প্রেম, আনন্দ, ভালোবাসা, বিষাদ- কিছুই বাদ যায়নি এই অনুষ্ঠানে। যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশ ও ভারতের শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পীদের এ ছিল এক অনন্য পরিবেশনা। অনুষ্ঠানে আগত দর্শকদের হৃদয়-মনে দীর্ঘদিন এই সংগীত উৎসব অমোচনীয় হয়ে থাকবে।