স্থাপত্যশিল্পে বাংলাদেশ আত্মনির্ভরশীল

রবিউল হুসাইন। স্থপতি, কবি, শিল্প-সমালোচক, ছোটগল্পকার, প্রাবন্ধিক ও সংস্কৃতিকর্মী। জন্ম ঝিনাইদহে। পেশা স্থাপত্যশিল্প হলেও সম্পৃক্ততা বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে। দ্রুত বর্ধনোন্মুখ এ শহরের অন্যতম আশাবাদী। কাব্যে-সংগীতে অগাধ বিস্তার। স্থাপত্যে বাংলাদেশের স্বয়ম্ভরত্ব নিয়ে কথা বলেছেন বেঙ্গল বারতার সঙ্গে।
বাংলাদেশে স্থাপত্যবিদদের কাজের পরিধি কতখানি বিস্তৃত?
স্থাপত্য একটা বড় পরিসর। আমরা যারা স্থাপত্য নিয়ে কাজ করি, তাদের বিভিন্ন রকম বিষয় নিয়ে কাজ করতে হয়। এর মধ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেমন হাসপাতাল, সরকারি ভবন, হোস্টেল, শপিং মলের নকশা প্রণয়ন করতে হয়। এসবের প্রয়োজন ও ব্যবহার অনুযায়ী ভবনের নকশা করতে হয়। থাকার জায়গা বা কাজের জায়গার জন্য আলাদা নকশা দরকার হয়। এসবের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কাজ করতে হয় আবাসন নিয়ে। বিশেষ করে ঢাকায় আবাসনের জন্য ভবন নির্মাণের চাহিদা বেশি। আর এ ক্ষেত্রে ছোট ছোট ফ্ল্যাটের চাহিদা বেশি।
ভবন নির্মাণে স্থাপত্যবিদের পরামর্শ নেওয়া সত্ত্বেও অপরিকল্পিত নগরায়ণ ঘটছে। এর কারণ কী?
সব সময়ই স্থাপত্যবিদেরা রাজউকের নীতিমালা মেনেই ভবনের নকশা প্রণয়ন করে থাকেন। এ ক্ষেত্রে একটা বিষয় আছে Floor Area Ratio (FAR)। এই তত্ত্ব অনুযায়ী মোট যতখানি জায়গার ওপর ভবন নির্মাণ হবে, তার অন্তত অর্ধেক জায়গা ফাঁকা রাখতে হবে। যাতে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচল বা বিশেষ জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াত করা যায়। সমস্যা হচ্ছে, আমরা পেশাদার স্থাপত্যবিদেরা রাজউকের এই নিয়ম মেনে নকশা করলেও ভবন নির্মাণের সময় মালিকেরা এই নিয়ম পুরোপুরি মেনে চলেন না। এ জন্যই ঘিঞ্জি আর অপরিকল্পিত নগর গড়ে উঠেছে এবং ঢাকা শহর দিনে দিনে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে যাচ্ছে।
এর থেকে উত্তরণের উপায় কী?
উত্তরণের পথ অবশ্যই আছে। এখন দিনকাল বদলাচ্ছে। যেমন বাড়ি বানানোর জন্য ব্যাংক লোন নিতে গেলে বা হাউজ বিল্ডিং থেকে লোন নিতে গেলে সেটা রাজউকের নীতিমালা মেনে করা হচ্ছে কি না, তা কঠিনভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। এ কারণে বেশির ভাগ মানুষ সজাগ হচ্ছে এবং নীতিমালার প্রতি আন্তরিক হচ্ছে। অপরদিকে শহরের বেশির ভাগ বাড়ি এখন বানাচ্ছে ডেভেলপার কোম্পানি। তারা তাদের ব্যবসায়িক সুবিধা ও সম্মান রক্ষার্থে রাজউকের নীতিমালার বাইরে যাচ্ছে না। এভাবে চললে ধীরে ধীরে আবাসনের বিদ্যমান সমস্যাগুলো নিরসন হয়ে যাবে। যা বড় একটা ইতিবাচক দিক।
আবাসনের চাহিদা ও জোগানের মধ্যে একটা জটিল সম্পর্ক বিদ্যমান। একে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
দিনে দিনে আবাসনের চাহিদা বদলেছে এবং লোকে নতুন জীবনধারার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে। একটা সময় ছিল, একটা প্লটে একটা বাড়ি ছিল। সেখানে যথেষ্ট ফাঁকা জায়গা রাখা সম্ভব হতো। কিন্তু এখন একটা প্লটে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে এবং একই পরিমাণ জায়গায় থাকছেন অনেক বেশি মানুষ। এই চাহিদা মেটাতে গিয়ে স্থাপত্যেও পরিবর্তন আসছে। গ্রামে যেমন বাড়ির মাঝখানে উঠান থাকে। এই বাড়তি স্থান অনেক কাজে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু সেটা বিবর্তিত হয়ে ফ্ল্যাটবাড়িতে হয়েছে ব্যালকনি। তা-ও নিরাপত্তার স্বার্থে সেটা গ্রিল দিয়ে ঘিরে দিতে হয়। এভাবে স্থাপত্য পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবনযাপন ও আচরণেও পরিবর্তন আসছে। বড় বড় পরিবার ভেঙে ছোট ছোট পরিবার হচ্ছে। মানুষে মানুষে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। সময়ের সঙ্গে ঢাকার জনসংখ্যাও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে।
যাদের সামর্থ্য আছে, তাদের দেখা যায় একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচতে ঢাকার আশপাশে বাগানবাড়ি করছে। সেখানে সপ্তাহান্তে বেড়িয়ে আসছে। সেটা নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন? সমাধান হিসেবে এটা কতখানি ইতিবাচক?
হ্যাঁ, এটা থেকেই কিন্তু বোঝা যায়, আমরা প্রচণ্ডভাবে ঢাকার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি। এই নির্ভরশীলতা অনেক জটিলতার মূল। এর জন্য দরকার বিকেন্দ্রীকরণ। যে পরিমাণ মানুষ প্রতিনিয়ত ঢাকায় আসছে, তা ধারণ করা এই শহরের পক্ষে সম্ভব নয়। সবকিছু সারা দেশে ছড়িয়ে না দিলে অগুনতি মানুষের ঢাকায় আগমন রোধ করা যাবে না। এখানেও ধীরে ধীরে ইতিবাচক পরিবর্তন হচ্ছে। ঢাকার বাইরে বড় শহরগুলোতে ডেভেলপারদের কর্মকাণ্ড বাড়ছে। সরকারও কিছু কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে। যেমন কেন্দ্রীয় কারাগার ঢাকার বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এটা অনেক আগেই করা উচিত ছিল। কারণ, এখানে বঙ্গবন্ধু থেকে শুরু করে দেশের সব বড় বড় নেতা থেকেছেন। জাতীয় চার নেতার মৃত্যু হয়েছে এখানেই। এই জেলখানা জাদুঘরে রূপ নেবে। এটা কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আছে।
একটা জনপদের স্থাপত্যের সঙ্গে সংস্কৃতির যোগসাজশ ব্যাপক। এ ক্ষেত্রে আমাদের সংস্কৃতিকে কি আমরা স্থাপত্যের মাধ্যমে তুলে ধরতে পারি না?
একটা দেশের স্থাপত্য তাদের সংস্কৃতি প্রদর্শনের মঞ্চ। পশ্চিমা বিশ্ব অনেক আগে থেকেই তাদের শক্তি-সৌর্য প্রদর্শনের জন্য স্থাপত্য ব্যবহার করেছে। মিসরের পিরামিড থেকে শুরু করে আজকের আরব বিশ্বও তাদের শক্তিমত্তা প্রদর্শনের জন্য বেছে নিয়েছে সুরম্য স্থাপত্য। কারণ, স্থাপত্যশিল্প দিয়ে একটা দেশের চরিত্র বোঝা যায়। এর মধ্য দিয়ে তার শিকড়, ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং জীবনযাপনের যে চেহারা, তা ফুটে ওঠে। স্থাপত্য অন্যতম একটা ‘শিল্পাস্ত্র’। আমরা রাতারাতি দেশকে পরিবর্তন করতে পারব না। তবে আবহমানকালের সঙ্গে সংগতি রেখে বসবাসের চাহিদা পূরণ করতে পারব। এই অস্ত্র দিয়ে আমরাও আমাদের দেশের চেহারা ফুটিয়ে তুলতে পারব। সুসংগত নগর পরিকল্পনা ও কৌশলী স্থাপত্য নকশা দিয়ে আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ফুটিয়ে তুলতে পারব। কারণ, আমরা এখন এ শিল্পে আত্মনির্ভরশীল।
আমাদের দেশের স্থাপত্য নিয়ে আপনি তাহলে বেশ আশাবাদী…
নিশ্চয়ই। নবীন-প্রবীণ স্থাপত্যবিদদের হাত ধরে এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের স্থাপত্যশিল্প। এঁদের হাত ধরেই একদিন বদলে যাবে ধূলি-মলিন দেশের চেহারা। আধুনিকতা ও ঐতিহ্যের মিশেলে তৈরি হবে নতুন আবাস। সেখানে আবারও পাখির ডাক শুনে ঘুম ভাঙবে, জানালা খুলতেই ঘর ভরে যাবে কামিনী ফুলের গন্ধে। সে দিন আর বেশি দূরে নয়।
সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।
আপনাকেও ধন্যবাদ।

 

ফাইল ছবি: মিজানুর রহমান খোকা