স্থাপত্য ভাবনায় আগামীর ঢাকা

জাদুর শহর কিংবা প্রাণের শহর- অনেক কিছু বলেই আমরা অভিহিত করি শহর ঢাকাকে। কিন্তু চরম অব্যবস্থাপনা আর দূষণের কারণে ঢাকার নিজেরই প্রাণ ওষ্ঠাগত। ৪০০ বছরের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসও তাই ধূসর ধুলোর আস্তরণে ঢাকা পড়ে থাকে। কারণ, পরিসংখ্যান বলছে, বসবাসের অনুপযোগী ঢাকা গোটা পৃথিবীর মধ্যে দ্বিতীয়। ‘তিলোত্তমা’ এ নগরীর পর্যাপ্ত সম্ভাবনা থাকা সত্তে¡ও সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার অভাবে আজ বিপর্যস্ত এক শহর। তবে শুভ পরিবর্তনের সুবাতাস বইতে শুরু করেছে। উন্নয়নের ছোঁয়া লাগছে এর আনাচে-কানাচে। তবু সমন্বিত একটি পরিকল্পনার আওতায় এখনো শহরটি সাজানো হয়নি। তেমন ভাবনা থেকেই অভিনব স্থাপত্যভাবনায় নতুন এক শহরের ছবি এঁকেছে বেঙ্গল ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেকচার, ল্যান্ডস্কেপস অ্যান্ড সেটেলমেন্টস।
গত ১৫ অক্টোবর বেশ আড়ম্বরেই উদ্বোধন হলো ‘ঢাকা নেক্সট: নতুন শহর ভাবনা’ নামের এক প্রদর্শনীর। গুলশানের বেঙ্গল আর্ট লাউঞ্জে পর্দা উঠল ঢাকার নতুন পরিকল্পনার। ভবিষ্যতের ব্যস্ত ঢাকার চাপ সামলে কীভাবে একে একটি সুসংগত নগরীতে পরিণত করা যায়, তারই পরিকল্পনা হাজির করল বেঙ্গল ইনস্টিটিউট। প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন মাননীয় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা প্রণয়নের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি খাত উন্নয়নবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, ঢাকার মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন (দক্ষিণ সিটি কপোরেশন), আনিসুল হক (উত্তর সিটি কপোরেশন), বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। অতিথিদের সঙ্গে আরও উপস্থিত ছিলেন বেঙ্গল ইনস্টিটিউটের উপদেষ্টা এ কে আবুল মোমেন। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান জনাব আবুল খায়ের, মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী এবং বেঙ্গল ইনস্টিটিউটের কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য এবং রিসার্চ ও ডিজাইনের পরিচালক স্থপতি সাইফ উল হক, বেঙ্গল ইনস্টিটিউটের একাডেমিক ডিরেক্টর স্থপতি মেরিনা তাবাশ্যুম, স্থপতি সালাউদ্দিন আহমেদ এবং স্থপতি এহসান খান। বেঙ্গল ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক অধ্যাপক কাজী খালিদ আশরাফ সংক্ষিপ্তভাবে ইনস্টিটিউটের গবেষণা প্রস্তাবগুলো তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন পেশার সুশীল নাগরিকদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি এই আয়োজনকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। হাতে আঁকা স্কেচ, কম্পিউটার রেন্ডার, মডেল, চলচ্চিত্রে আর লেখায় ফুটে উঠেছে এই শহর নিয়ে ভাবনা আর ভালোবাসা।
স্থপতি কাজী খালিদ আশরাফের উপস্থাপনার পরে উপস্থিত অতিথিবৃন্দ এক প্রাণবন্ত আলোচনায় অংশগ্রহণ নেন। অর্থমন্ত্রীর বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা প্রণয়নের গুরুত্ব আরোপের বিষয়টির সঙ্গে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী যোগ করেন সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনার সঙ্গে এর সমন্বয় সাধন করার কথা। উভয় মেয়র প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক ও স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা করেন। মেয়র মোহাম্মদ সাইদ খোকন ইনস্টিটিউটের ধারণা এবং প্রস্তাবগুলোর প্রশংসা করেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পরে প্রদর্শনীটি সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। গুলশানের বেঙ্গল আর্ট লাউঞ্জে প্রদর্শনীটি চলে ১ থেকে ২০ নভেম্বর পর্যন্ত। এ ছাড়া ২৪ থেকে ২৮ ডিসেম্বর লাখো মানুষ প্রদর্শনীটি দেখার সুযোগ পায় পঞ্চম বেঙ্গল ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিক ফেস্টিভ্যাল প্রাঙ্গণে।
ভাবনার প্রস্তুতি
‘ঢাকা নেক্সট: নতুন শহর ভাবনা’ শীর্ষক প্রদর্শনীতে মূলত ‘ঢাকা নেক্সাস’, ‘কেন্দ্রীয় যোগাযোগ করিডর’, ‘বুড়িগঙ্গার নতুন পাড়ে’ এবং ‘গুলশান, কারওয়ান বাজার সিভিক করিডর’ প্রকল্পগুলো উপস্থাপন করা হয়েছে। এই প্রকল্পগুলো আসলে বাংলাদেশের শহর নিয়ে এক নতুন চিন্তা-চেতনার ফসল। বেঙ্গল ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, জলবায়ু, বিশ্বায়নের প্রভাব, নগরমুখী জনসংখ্যার চাপ, সংকুচিত প্রাকৃতিক সম্পদ- এসব সামনে রেখে স্থাপত্যচিন্তা কী হওয়া উচিত, তা নিয়ে নতুন করে অনুসন্ধান ও পরিকল্পনা করে যাচ্ছে। কীভাবে ঢাকাকে আবার চমৎকার, শোভনীয় আর মানবিক একটি শহরে রূপান্তর করা যায়, সেই উদ্দেশ্যেই বেঙ্গল ইনস্টিটিউটের এই আয়োজন।
কেমন হবে আগামীর ঢাকা?
শত বাধা-বিপত্তির মাঝে থেকেও ঢাকা যেন এক গতিময় শহরের প্রতিচ্ছবি। ‘ইউকে ইকোনমিক আউটলুক’-এর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মধ্যে ঢাকার জিডিপি হবে ২১৫ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং পৃথিবীর ১৫০টি নগরের অর্থনীতির মধ্যে ঢাকার অবস্থান হবে ৪৮তম, যেখানে ঢাকা থাকবে ব্রাসিলিয়া, রোম, করাচি ও মন্ট্রিয়লের ওপরে। কিন্তু পরিবর্তনের এই দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন হলো, আমরা কি প্রস্তুত?
ক্রমবর্ধমান এই শহরের জনসংখ্যার এক বিরাট অংশ এখনো নাগরিক সুবিধাবঞ্চিত। আর এই বঞ্চনার প্রতিফলন বাসযোগ্য নগরের তালিকায় আমাদের নীরব উপস্থিতি। একসময়ের উদ্যানশোভিত ঢাকা আজ নাগরিক ও পরিবেশদূষণে বিপর্যস্ত। অথচ পঞ্চাশের দশক পর্যন্তও ঢাকার পরিচয় ছিল সবুজ বৃক্ষ পল্লবিত, খালের নেটওয়ার্ক পরিবেষ্টিত নদীতীরবর্তী এক মনোমুগ্ধকর শহর। সুদূরপ্রসারী চিন্তা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং এর সক্রিয় বাস্তবায়নই পারে নতুন এক বাসযোগ্য, অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ এবং পরিবেশগত বৈষম্যহীন ঢাকাকে ফিরিয়ে দিতে।
ঢাকা নেক্সাস
আপন ছন্দে বেড়ে চলছে ঢাকা। পরস্পর সমন্বয়হীন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে প্রতিনিয়ত বদলে যাওয়া এই নগর তাই ব্যর্থ এর কেন্দ্রমুখী কিংবা সামগ্রিক চাপ প্রশমনে এবং উপযুক্ত নাগরিক পরিবেশ গঠনে।
পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যথাযথ যোগাযোগব্যবস্থার কলেবর বৃদ্ধি না হলে এক সংকটময় অবস্থার সৃষ্টি হয়। কিন্তু বিচ্ছিন্ন অঞ্চলগুলো দৈনিক যাত্রীবাহী রেল, লাইট রেল, বিস্তৃত বাস নেটওয়ার্ক, নদীভিত্তিক ফেরি ও যাত্রীবাহী নৌযান দ্বারা সুসংগঠিত পরিবহনব্যবস্থার মাধ্যমে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত থাকলে নানাবিধ পরিষেবার সুষম বণ্টন সম্ভব হয়। যেমন উত্তর-দক্ষিণ রেল করিডরে দ্রুতগামী রেল চলাচল ঢাকা থেকে ময়মনসিংহের যাত্রা সময় কমিয়ে আনবে মাত্র দু’ঘণ্টায়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান- যেকোনো প্রয়োজনে এক শহর হবে অন্যের পরিপূরক; দ্রুততম সময়ে স্বচ্ছন্দ ভ্রমণ ঋদ্ধ করবে বলে নেক্সাসের ধারণা। রাজধানীর কর্মব্যস্ত দিন শেষে মানুষ ফিরে যাবে তার ময়মনসিংহের নিজ আবাসস্থলে, আলো-বাতাসপূর্ণ সবুজে ঘেরা গৃহকোণে। ব্রহ্মপুত্রের পাড় ধরে করবে সান্ধ্যভ্রমণ।
বেঙ্গল ইনস্টিটিউ প্রস্তাবিত তিন স্তরের যোগাযোগ বলয় হবে ঢাকা নেক্সাসের মূল অবকাঠামো। প্রথম বলয়টি ঢাকার চারপাশ ঘিরে থাকা বেড়িবাঁধের রাস্তা দিয়ে টঙ্গী, সাভার ও কেরানীগঞ্জকে দ্রুত সড়ক, বৃত্তাকার রেলপথ ও নৌপথ দ্বারা সংযোগ স্থাপন করবে। বৃত্তাকার স্থল, রেল ও নৌপথ এই বলয় অন্তর্বর্তী স্টেশনগুলোকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করবে। আর গুরুত্বপূর্ণ নগরকেন্দ্র ও অন্যান্য যোগাযোগ চক্র পরবর্তী বলয়ের সঙ্গে সংযুক্ত করবে স্থল ও রেলপথ।
দ্বিতীয় বলয়টি নারায়ণগঞ্জ, ভুলতা, পুবাইল, গাজীপুর ও হেমায়েতপুরকে সংযুক্ত করবে। উত্তর স্টেশন হিসেবে গাজীপুর-জয়দেবপুর এবং দক্ষিণ স্টেশন হিসেবে কেরানীগঞ্জ হবে এই বলয়ের মূল রেল সংযোগস্থল। উত্তরাঞ্চলের নানা প্রান্তে ছুটে চলা ট্রেন যুক্ত থাকবে গাজীপুর-জয়দেবপুর স্টেশনের সঙ্গে, আর দক্ষিণ, দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ-পশ্চিমগামী ট্রেন যুক্ত থাকবে কেরানীগঞ্জের সঙ্গে।
তৃতীয় বলয়টি মুন্সীগঞ্জ, মাওয়া, নরসিংদী, কাপাসিয়া, কালিয়াকৈর, মানিকগঞ্জ এবং এর পার্শ্ববর্তী শহর ও জনপদকে যুক্ত করবে। চক্রাকার স্থল ও রেলপথ ঢাকা বিভাগ বহির্ভূত অঞ্চলসমূহের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোকে সংযুক্ত রাখবে।
প্রতিটি শহরকেন্দ্র এবং এর মধ্যবর্তী স্থানের পূর্বনির্ধারিত পরিধির ওপর নির্ভর করেই এই সুসংহত ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। কয়েকটি কেন্দ্রের অন্তর্বর্তী স্থানে থাকবে জনপদ, গ্রাম, কৃষিজমি, প্রাকৃতিক বনভূমি, জলাধার ও প্লাবনভূমি। যেভাবে এই কেন্দ্রে আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্পকারখানা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রশাসনিক ব্যবহারসমূহ উল্লেখ থাকবে, সেভাবেই অন্তর্বর্তী স্থানের বর্তমান ভূমি ব্যবহার ও সম্ভবনার দিকেও নজর দিতে হবে।
কেন্দ্রীয় যোগাযোগ করিডর
যেকোনো শহর উন্নয়নের নীতিনির্ধারণ, ভূমি ব্যবস্থাপনা, নাগরিক সুবিধার সহজপ্রাপ্যতা, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থা ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত। আমাদের বিশ্বাস, সমন্বিত এবং সুপরিকল্পিত যোগাযোগের পেছনে বিনিয়োগ একটি নতুন ঢাকার সূচনা করবে।
একারণেই জল, স্থল ও রেল- এই তিন ধরনের যোগাযোগব্যবস্থার একটি সমন্বিত রূপের কথা ভাবা হয়েছে, যা বিদ্যমান অবকাঠামো এবং স্থাপনার কাজে লাগিয়েই বাস্তবায়ন সম্ভব।
নদীকেন্দ্রিক যোগাযোগব্যবস্থায় ঢাকার নদীপথে ওয়াটার বাস, ওয়াটার ট্যাক্সি এক সহজ সমাধান। নদীর তীর সংরক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নের জন্য এবং নতুন আর্থসামাজিক সম্ভাবনার বিকাশের জন্য নৌ যোগাযোগ হতে পারে এক চমৎকার মাধ্যম; যা নদীবিমুখ ঢাকাকে করবে নদীমুখী। শুধু বৃত্তাকার নদীপথ নয়, জালের মতো ছড়িয়ে থাকা খাল-লেক-নদী- সব মিলে হবে এক অনন্য জলপথ।
ঢাকার জন্য প্রস্তাবিত মেট্রোরেলের পাশাপাশি ফিডার রেল করিডর চিন্তা করা যায়। সে রকমই প্রস্তাব রাখা হয়েছে খিলক্ষেত থেকে ধানমন্ডি-কলাবাগান পর্যন্ত লাইট রেল বা এলআরটি। পথিমধ্যে লাইনটা সংযোগ করবে গুলশান এলাকা, হাতিরঝিল, কারওয়ান বাজার ও পান্থপথ। প্রস্তাবিত মেট্রো লাইনের সঙ্গেও সংযোগ থাকবে। যেখানে গাড়ি বা বাসে করে গুলশান থেকে কলাবাগান যেতে লেগে যায় কম পক্ষে দেড় ঘণ্টা, সেখানে এলআরটিতে যাতায়াত করা যাবে মাত্র আধঘণ্টায়।
একটি শহরের যোগাযোগব্যবস্থার সফলতা বহুলাংশে নির্ভর করে এর হাঁটা পথ ব্যবস্থাপনার ওপর। যেকোনো প্রকার গণপরিবহন ব্যবহারের জন্য দরকার পরস্পর সংযুক্ত হাঁটা পথ। এ কারণে ঢাকার ফুটপাতগুলোর সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ আশু প্রয়োজন। কেননা বাস কিংবা ট্রেন থেকে নেমে, এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশনে যেতে, স্টেশন থেকে অফিস অথবা বাড়ির পথে স্বাচ্ছন্দ্যময় হাঁটা পথ নিশ্চিত করে গণপরিবহনের সফলতা।
সুবিন্যস্ত ঢাকা পরিসর
একটি বাসযোগ্য শহরের জন্য শুধু ভবন নির্মাণই যথেষ্ট নয়। ভবনের পাশাপাশি প্রয়োজন উপযুক্ত প্রতিবেশ। ভবন আর তার চারপাশ মিলে এক পরিপূর্ণ স্থাপত্য। গণপরিসরের উৎকর্ষ সাধন তাই দারুণ একটা শহরের পূর্বশর্ত।
উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ ও গণপরিসর যদি হয় বাসযোগ্য শহরের মাপকাঠি, তাহলে হাঁটা পথ এই ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আসলে হাঁটা পথই নাগরিক প্রতিবেশের প্রত্যক্ষ প্রমাণ, মানবিকতার পরিমাপক। শহরে হাঁটার জন্য চাই নিরাপদ, প্রশস্ত, নির্বিঘ্ন ফুটপাত, নদীতীরবর্তী হাঁটা পথ এবং গাড়ির রাস্তার সঙ্গে পার্শ্বরাস্তা। বিচ্ছিন্ন হাঁটা পথগুলোকে একত্র করে হবে এক সংগঠিত পায়ে হাঁটা নেটওয়ার্ক।
বুড়িগঙ্গার নতুন পাড়ে
ঢাকা আজ বুড়িগঙ্গা থেকে অনেক দূরে সরে এসেছে। সেই নদীর তীর, বাকল্যান্ড বাঁধ, সদরঘাট, ওয়াইজঘাট গন্তব্যস্থল হিসেবে উপভোগ করা কিংবা যাওয়া খুব দুরূহ ব্যাপার। নদীর পাড় ফিরিয়ে আনতে হবে জনগণের ব্যবহারের জন্য। নতুন করে সাজানো এই ‘পুরান ঢাকা’ থাকবে পুনরুদ্ধার করা নদীর পাড়ে। নদীর পাড় হবে সবার জন্য, হেঁটে বেড়ানোর জন্য, দৈনন্দিন বিনোদনের জন্য। আর পুরো এলাকাজুড়ে নতুন এক অর্থনৈতিক উজ্জীবনের জন্য।
আমাদের প্রস্তাবে শহরের যানজট, অলিগলি পেরিয়ে চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ ধরে এগিয়ে গেলে বুড়িগঙ্গা নদীর পাড় ঘেঁষে থাকবে বাঁধানোর হাঁটা পথ, বুড়িগঙ্গার দক্ষিণে কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত। সবুজ গাছের নিচে নিরবচ্ছিন্ন পথের ধারে নিরিবিলি বসার জায়গা, আর থাকবে ছোট ছোট চত্বর। শীতের শান্ত জল, বর্ষার ঘোলা জল, বন্যার নতুন জল, তার পাড়ে সবার জন্য সাজানো সিঁড়ি। ছোট্ট সংযোগ সেতু পেরোলেই মূল হাঁটা পথের সঙ্গে সংযুক্ত জেটিতে পাওয়া যাবে নৌকা, ওয়াটার বাস, ওয়াটার ট্যাক্সি। হেঁটে নদী পার হতে চাইলে নতুন পথচারী সেতু ধরে কেরানীগঞ্জে চলে যাওয়া যাবে। ভাসমান দ্বীপে হাতছানি দেবে নানান মৌসুমি ফুল। বর্ষার জল নেমে গেলে জেগে উঠবে ডুবে থাকা হাঁটা পথ, উঁচু ঢিবিতে যাওয়ার রাস্তা- সব মিলিয়ে সাজানো পরিপাটি আয়োজন। এ প্রস্তাবে আহসান মঞ্জিল বরাবর নদীর পাড় ধরে উঁচু-নিচু, ছোট-বড় নানান আকার ও আকৃতির সিঁড়ি, ঘাট আর চৌচালা ধরনের কিওস্ক থাকছে।
গুলশান-কারওয়ান বাজার সিভিক করিডর
পাবলিক স্পেস, পার্ক ও হাঁটা পথ মিলে প্রয়োজন নতুন নাগরিক নেটওয়ার্ক। নতুন এ ভাবনায় গুলশান অ্যাভিনিউকে সাজিয়েছি একটি সিভিক করিডর হিসেবে, প্রস্তাব করেছি হাঁটা পথের নেটওয়ার্কের। নিছক গাড়ি চলাচলের ইন্টারসেকশন বা যেমন-তেমন গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা অথবা নৈরাজ্যময় বাজার কমপ্লেক্সের বদলে আমরা ধারণা দিয়েছি নতুন ধরনের সিভিক স্পেস বা জনমানুষের জায়গার। আমাদের ধারণা, গুলশানের এই প্রস্তাবিত পদচারী ও যাতায়াতব্যবস্থা পুরো ঢাকা শহরের জন্য হতে পারে কার্যকর উদাহরণ।
আগামীর ঢাকা পরিকল্পনায় যুক্ত ছিলেন যাঁরা
পরিচালনায়: স্থপতি কাজী খালিদ আশরাফ (প্রধান নির্দেশক), স্থপতি সাইফ উল হক এবং স্থপতি মো. মাসুদুল ইসলাম
গবেষণা ও ডিজাইনে: নুসরাত সুমাইয়া, ফাতিহা পলিন, রেদওয়ান শহীদুল বাসার, মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী, তাজরিন আহমেদ, মোহাম্মদ আরফার রাজি, আফরিন আহমেদ রোচনা, চৌধুরী ফারাহ জাকি, মাইশা হোসাইন, তামান্না তাবাস্সুম, মো. ফয়সাল হুদা, হাসান মোহাম্মদ রাকিব, রুবাইয়া নাসরীন, ধ্রুব আলম, ফারহানা রাশীদ তনু, তাকি আহমেদ, নাজমুস সাকিব, আনজুম আদিল।
প্রদর্শনী লেআউট এবং ডিজাইনে: রাশেদ চৌধুরী (প্রধান নির্দেশক), ইয়ানা জোহা, সুহাস নাহিয়ান, নাভিদ হাসনাইন, ইর্তেযা আমীন ও সাকিব আহমেদ লাম।
প্রদর্শনী উপদেষ্টা: সালাউদ্দিন আহমেদ, কাফি নেওয়াজ।
চিত্রায়ণে: রাহাত হাসান, মো. কামরুল হাসান, সাদমান আহমেদ জাকি, আনিশা আহমেদ, সাদমান জামান, নাজমুস সাকিব, বিন সায়ীদ বাখতি, এস এম কায়কোবাদ, মো. নামায়েতুল্লা লিওন, তানভীর হাসান, তৌহিদুল, রিফাত, ফারহানা নিজাম চৌধুরী ও মানসুরা সুমি।
চলচিত্রায়ণে: অমিত আশরাফ, জাহিদ খান।
মডেল নির্মাণে: জুবাইর হাসান (নির্দেশক), শহিদুল ফারুক (নির্দেশক), আল মুত্তাসিম স্মিত, সাজিব, ফেরদৌস, মকিত মরশেদ পরাগ, মুহাম্মেদ ফারযাদ ঘানি, আব্দুল্লাহ আল মুকিত, মো. মিরাজুল ইসলাম, মো. মনিরুজ্জামান, মো. মাহতাসিম ও শাহরিয়ার রাফাত।