স্বপ্নচারী একজন

ফজলে হাসান আবেদ ১৯৩৬ সালের ২৭ এপ্রিল হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পাবনা জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর ব্রিটেনের গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ে নেভাল আর্কিটেকচার বিষয়ে শিক্ষা লাভ করেন। পরে তিনি লন্ডনের চার্টার্ড ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টসে ভর্তি হন। ১৯৬২ সালে প্রফেশনাল কোর্স সম্পন্ন করেন।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশে স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু হলে তিনি ইংল্যান্ডে গিয়ে সহমর্মী বন্ধুদের সঙ্গে মিলে ‘অ্যাকশন বাংলাদেশ’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। এরপর সংগঠনটির মাধ্যমে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে স্বাধীনতাযুদ্ধের পক্ষে সমর্থন আদায়, প্রচার, তহবিল সংগ্রহ ও জনমত গঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করেন।
মুক্তিযুদ্ধকালে ধ্বংসস্তুপে পরিণত হওয়া সিলেটের প্রত্যন্ত অঞ্চল শাল্লাকে তিনি তাঁর কর্ম-এলাকা হিসেবে বেছে নেন। এই কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় গড়ে তোলেন ব্র্যাক। গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র মানুষের জীবনমান উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি নানা কর্মসূচি গ্রহণ করে তাঁর দীর্ঘ অভিযাত্রার সূচনা ঘটে। দরিদ্র মানুষ যাতে তাদের অন্তর্নিহিত সম্ভাবনার বিকাশ ঘটিয়ে নিজেরাই নিজেদের ভাগ্যনিয়ন্তা হয়ে উঠতে
পারে, সেই লক্ষ্যে তিনি কর্মসূচি পরিচালনা করে যাচ্ছেন।

বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের বেঙ্গল ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেকচার, ল্যান্ডস্কেপস অ্যান্ড সেটেলমেন্টস-এর অন্যতম প্রাণপুরুষ কথা বললেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের কর্মপ্রবাহ সম্পর্কে…

আপনি বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের সুহৃদ। জন্মলগ্ন থেকে এ সংগঠনের নানা কর্মতৎপরতা অবলোকন করেছেন। এই প্রতিষ্ঠানের কর্মপ্রবাহকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
আমাদের শিল্প ও সংস্কৃতি অঙ্গনে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন তার জন্মলগ্ন থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। আমাদের আবহমানকালের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বরাবরই অত্যন্ত সমৃদ্ধ। সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজন রয়েছে। প্রয়োজন রয়েছে উত্তরাধিকারকে বহমান রাখার এবং তাকে আরও বিকশিত করার। আমি মনে করি, বেঙ্গল ফাউন্ডেশন তার কর্মপ্রবাহে এ বিষয়গুলোকেই নিষ্ঠা ও বিশ্বস্ততার সঙ্গে ধারণ করতে সক্ষম হয়েছে। আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের যে বহুমাত্রিক রূপরেখা, আমি মনে করি, বেঙ্গল ফাউন্ডেশন তার বৈচিত্র্য ও বৈভবকে তুলে ধরতে পেরেছে এবং সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো খুঁজে বের করে তাতে অতুলনীয় অবদান রাখছে। আমাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে এই কাজটি অত্যন্ত মূল্যবান।
বেঙ্গল ফাউন্ডেশন শিল্প, সাহিত্য, সংগীত ও চলচ্চিত্র নিয়ে কাজ করছে। এমনকি শাস্ত্রীয় সংগীতের উৎসবও করছে। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক কর্মপ্রবাহে এর প্রাসঙ্গিকতা সম্পর্কে আপনার কী মনে হয়?
হ্যাঁ, শিল্পকলার অনেকগুলো শাখায় বেঙ্গল ফাউন্ডেশন কাজ করছে। সাহিত্য, সংগীত, চিত্রকলা, কারুশিল্প, চলচ্চিত্র প্রভৃতি ক্ষেত্রে বেঙ্গলের অবদানকে আমি খুবই অর্থবহ বলে মনে করি এবং আমাদের সাংস্কৃতিক কর্মপ্রবাহে এর প্রাসঙ্গিকতা অনস্বীকার্য। সংস্কৃতি হচ্ছে একটি জাতির আত্মার পরিচয়। একটি জনগোষ্ঠীর বস্তুগত সমৃদ্ধির প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু পাশাপাশি তার চেতনার জগৎও আলোকিত হওয়া প্রয়োজন।
শিল্পকলার বিভিন্ন ক্ষেত্রে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে এবং বহুবিধ কর্মতৎপরতা পরিচালনা করে বেঙ্গল সেই আত্মিক বিকাশেই নিবিড় পরিচর্যা প্রদান করে চলেছে। এর ফলে আমাদের শিল্পকলা চর্চার সমগ্র চালচিত্রটি বর্ণাঢ্য হয়ে উঠছে। এসবের পাশাপাশি এই ক্ষেত্রটিতে নবীনদের আত্মপ্রকাশের পথও প্রশস্ত হচ্ছে। সর্বোপরি আমাদের সৃজনশীলতা ও নান্দনিকতার যে জগৎ, সেটি সমৃদ্ধ হচ্ছে। বিশেষত শাস্ত্রীয় সংগীত নিয়ে বেঙ্গলের সুবৃহৎ আয়োজনটির কথা আমি বলতে চাই। আমাদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ইতিহাসে এটি এক অসাধারণ উদ্যোগ। শাস্ত্রীয় সংগীতের
শুদ্ধতার ব্যাকরণকে ছাপিয়ে এই আয়োজন সাধারণ্যে সমাদৃত হয়েছে। যে বিপুল উৎসাহ ও উদ্দীপনায় সাধারণ শ্রোতা-দর্শক একে গ্রহণ করে নিয়েছেন, তাও এক অনন্য ঘটনা। আমি জানি, শুধু বার্ষিক উৎসব নয়, শাস্ত্রীয় সঙ্গীত বিদ্যালয় স্থাপন করে বেঙ্গল আমাদের শিক্ষার্থীদের জন্য এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। এই বিদ্যালয়ে স্বনামধন্য উচ্চাঙ্গসংগীতশিল্পীদের আমন্ত্রণ করে নিয়ে আসা হচ্ছে। আমাদের সঙ্গীত শিক্ষার্থীরা
পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ উচ্চাঙ্গসংগীতশিল্পীদের কাছে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে। বেঙ্গলের এসব প্রয়াসকে আমি খুবই মূল্যবান কাজ বলে মনে করি।
বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠিত বেঙ্গল ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেকচার, ল্যান্ডস্কেপস অ্যান্ড সেটেলমেন্টস-এ আপনি অন্যতম প্রাণপুরুষ। এই প্রতিষ্ঠানে কর্মশালা, পাঠচর্চা ও গবেষণার মাধ্যমে প্রাগত পন্থার বাইরে আমাদের নদী, মাটি, গাছপালা, নগর ও অবকাঠামোর সামগ্রিক উন্নয়নের চেষ্টা করা হচ্ছে। দেশ-বিদেশের সেরা চিন্তাবিদ, কর্মকুশলী ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বিত চেষ্টায় এটি করা সম্ভব। এ বিষয়ে আপনার কী মত?
আমি এই কর্মযজ্ঞের প্রাণপুরুষ নই। বেঙ্গল ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেকচার, ল্যান্ডস্কেপস অ্যান্ড সেটেলমেন্টস-এর প্রকৃত প্রাণপুরুষ হচ্ছেন আবুল খায়ের। আমিও এর সঙ্গে যুক্ত আছি। আমি মনে করি, বেঙ্গলের এই প্রতিষ্ঠান আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য বাংলাদেশকে নবধারায় সাজিয়ে তোলার কর্মকাণ্ডের সূচনা করবে। প্রকৃতি-আশ্রয়ী নাগরিক জীবনের অবকাঠামো তৈরিতে এটি সৃজনশীল অবদান রাখবে। মূলত আমাদের গ্রাম ও নগরকে সমন্বিত করে আমরা যদি নবতর সৃজনশীলতায় নিজেদের জীবনধারাকে গড়ে তোলার প্রয়াসে এগিয়ে নিতে পারি, সেটা হবে বেশ বড় কাজ। এ ক্ষেত্রে আমাদের আগামী প্রজন্মের মধ্যে কর্মচাঞ্চল্যের সৃষ্টি হবে, ক্রমে সেই ধারা বেগবান হয়ে উঠবে। আমি আশা করি, দেশ-বিদেশের স্বনামধন্য স্থপতি, চিন্তাবিদ এবং কর্মকুশলীরা এই কর্মোদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একে ফলপ্রসূ করে তুলবেন।