স্বপ্নহীনতা অথবা স্বপ্ন নিয়ে চলার গল্প

এক যে আছে এক ঘর, পাতালে। মাটির তলায় সেথা না পৌঁছে সূর্যের আলো, না পৌঁছে বাতাস। তার মধ্যেই আশ্রয় নিয়েছে কিছু ছন্নছাড়া হতভাগ্য। আছে জুয়াড়ি, চোর, ব্যর্থ অভিনেতা, হতগৌরব অভিজাত, বারবনিতা, মুচি, শ্রমিক, তালার মিস্ত্রি, পশম ব্যবসায়ীর মতো বিচিত্র সব পেশাজীবীরা। প্রত্যেকের জীবনই কক্ষচ্যুত, নামানুষের। জীবন ও মৃত্যুর মাঝের ব্যবধানও ঘুচিয়ে দেওয়া কীটসদৃশ জীবনের মাঝেও জ্বলে ওঠে কিছু আশা। সেইখানে নাতাশাকে স্বপ্ন দেখায় পেপেল। সেই অন্ধকার কুঠুরিতে হাজির হয় ভবঘুরে এক বৃদ্ধের, যার নাম লুকা। গোটা দুনিয়াটাই যার কাছে সরাইখানা। ছন্নছাড়াদের নিভন্ত প্রদীপে উসকানি দিয়ে হারিয়ে যায় সে। ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার তুমুল আলোড়নে জীবনের প্রতিপক্ষই হয়ে ওঠে জীবন স্বয়ং। কালজয়ী রুশ সাহিত্যিক ম্যাক্সিম গোর্কির ‘দ্য লোয়ার ডেপ্‌থস’ নাটকের গল্পটাই যে এরকম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষক তানভীর নাহিদ খানের নির্দেশনায় নাটকটি মঞ্চে আনছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগ। কালজয়ী এই নাটকটি বাংলায় অনুবাদ করেছন চলচ্চিত্র নির্মাতা ও লেখক তানভীর মোকাম্মেল। ‘মা’ উপন্যাসের জন্য বাংলাদেশে সুপরিচিত হলেও নাট্যকার হিসেবেও যে কতখানি সার্থক সৃজনশিল্পী ছিলেন ম্যাক্সিম গোর্কি তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ‘দ্য লোয়ার ডেপ্‌থস’। তাঁর অন্যান্য কালজয়ী সৃষ্টির মতোই অমানিশার মধ্যেও জীবনের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার জীবনমুখী প্রয়াসের সুর এই নাটকেও দৃশ্যমান।

নাটকের চরিত্রগুলো যেন নিষ্ঠুর বাস্তবের বিপরীতে কল্পিত আরামদায়ক মিথ্যার প্রলেপে স্বস্তি পেতে চায়। কিন্তু তারপরেও বাস্তবতাকে এড়াতে পারেনা। তাদের দুর্দশাকে নাট্যকার স্রেফ নিয়তির লাঞ্ছনা হিসেবে উপস্থাপন করেননি বরং তাদের এই দুর্দশা কোন সামাজিক-রাজনৈতিক ব্যবস্থার কারণে তৈরি হয় সেদিকেই নির্দেশ করেছেন।

নাটকটির মহড়ার দৃশ্য

নিম্নবর্গীয় মানুষের আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাসের শিল্পিত বয়ানের মাধ্যমে আশাবাদী রূপকল্পের রচনাই এই প্রযোজনার লক্ষ্য। প্রযোজনার প্রাসঙ্গিকতা প্রসঙ্গে নাটকটির নির্দেশক তানভীর নাহিদ খান বললেন, ‘১৯০১ সালে রচিত হলেও এই নাটককে অতিক্রম করতে পারেনি সময়। কালের ধুলোয় একটুও ম্লান হয়নি এর আবেদন। বরং আজকের এই সন্ত্রাস-উপদ্রুত পৃথিবীতে বাস্তুহারা, সর্বহারা, রাষ্ট্রহারা মানুষের দুর্দশার বাস্তবতাকে এক তীর্যক দৃষ্টিতে উন্মোচন করে এই নাটক।’ থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের অন্যান্য প্রযোজনার মতোই ‘দ্য লোয়ার ডেপ্‌থস’-ও শিক্ষক-ছাত্রদের সম্মিলিত সৃজনশীল প্রচেষ্টা বলেই জানালেন নির্দেশক তানভীর নাহিদ খান।

উল্লেখ্য, নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বিভিন্ন ব্যাচের শিক্ষার্থীদের নিয়ে নাটক প্রযোজনা করে চলেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগ। সেই ধারাবাহিকতায় বিভাগের ৫ম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে মঞ্চায়ন হতে যাচ্ছে ‘দ্য লোয়ার ডেপ্‌থস’। আগামী ৭ থেকে ১১ মে, প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭টা থেকে নাটকটির প্রদর্শনী শুরু হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট-মণ্ডলে। প্রতিটি প্রদর্শনীর পূর্বে মিলনায়তনের বাইরে থেকে প্রবেশ টিকেট সংগ্রহ করা যাবে।