স্বাধিকার, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব

অতীতকে যারা ভুলে যায়, সেই অতীতকেই পুনরায় যাপন করার দণ্ড তাদের ভোগ করতে হয়।

– দার্শনিক জর্জ সান্তায়ানা

বাঙালি জাতিসত্ত্বার বিকাশ কিছুটা অদ্ভুত। মধ্যযুগে যখন ভারতের প্রধান প্রধান সামরিক রাষ্ট্রগুলো সরাসরি দিল্লির শাসন মেনে নিচ্ছে, তখন বাঙালিরাই লড়াই করছে স্বাধীনতার জন্য। বাঙ্গালাহ্ শব্দটি প্রথম উদ্ভূতও হয়েছে এ রকম অবস্থা থেকে। দিল্লির বেতনভোগী ইতিহাসবিদরা তাই ইতিহাস গ্রন্থের পাতায় পাতায় লিখে গেছেন বাংলার আবহাওয়া কিংবা মানুষের কুৎসা।

বঙ্গ বা বাংলার প্রাচীনতম আর্যগ্রন্থ ঋগ্বেদে যদিও বঙ্গ সম্পর্কে তেমন গুরুত্ববহ কোনো তথ্য নেই। মেগাস্থিনিসের রচনায় এ অঞ্চল সম্পর্কে রয়েছে বিস্তারিত বিবরণ। গাঙ্গেয় উপত্যকায় তার সময়কালে সবচেয়ে দুর্ধর্ষ সেনাবাহিনী অবস্থান করতো ইন্ডিয়ায়। তিনি মন্তব্য করেন, মধ্যযুগের বাঙ্গালাহতে পরিণত হওয়ার আগে প্রাচীন যুগে বাংলাদেশ ছিল কিছু জনপদে বিভক্ত। কর্ণসুবর্ণের অধিপতি এবং ভারতের তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী নৃপতি হর্ষবর্ধনের প্রবলতম প্রতিদ্বন্দ্বী শশাঙ্কই ছিলেন প্রথম স্বাধীন বাঙালি নৃপতি। পরবর্তী সময়ে বাংলাই হয়ে ওঠে ভারতের রাজনৈতিক ভাগ্য নিয়ন্ত্রক। পাল রাজবংশ বাংলাকে কেন্দ্র করেই গড়ে তোলে প্রাচীন ভারতের অন্যতম শক্তিশালী রাষ্ট্র।

মধ্যযুগে মুসলিম বহিরাগতরা যখন বাংলায় প্রবেশ করে, তখন সমগ্র ভারতবর্ষেই চলছিল এক নতুন কাল। বাংলা আধুনিক রাষ্ট্রতত্ত্বের সংঙ্গানুযায়ী প্রথম রাষ্ট্র হয়ে উঠে শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের নেতৃত্বে। এ সময় কেন্দ্রীয় ভারতের সঙ্গে প্রতি মুহূর্তে নিরন্তর লড়াই করে বাঙালি জাতি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে। দিল্লির প্রতি অনুগত পরিব্রাজক ইবনে বতুতা তাই কিতাবুল বেহালায় লিখেছেন, বাংলা হলো ধনসম্পদে পূর্ণ দোযখ। তার এই ব্যাখ্যায়ন খানিকটা শৃগালের আঙুর ফল ভক্ষণেরই মতো।

জাতি হিসেবে বাঙালি স্বাধীনচেতা। ভারতবর্ষের প্রথম ঔপনিবেশিক আগ্রাসন প্রতিরোধের চেষ্টা কিন্তু হয়েছে এ বাংলায়। পলাশীতে নবাব সিরাজদ্দৌলার পরাজয় সমগ্র ভারতের প্রেক্ষিতে এক অনস্বীকার্য ও অনভিপ্রেত ঐতিহাসিক মুহূর্ত। দুঃখের বিষয় হলো এ জাতিতে মীর জাফরেরও অভাব হয়নি। স্বাধীনতা রক্ষার জন্য যেমন বুকের তাজা রক্ত দিতে দুঃসাহসী বাঙালি ছুটে গেছে, তেমনি অল্প পয়সায় বিকিয়ে দেওয়ারও লোকের অভাব হয়নি। বঙ্গেই প্রথম দুইশ’ বছরের ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম সামরিক লড়াই শুরু হয়েছে। ব্যারাকপুরে ১৮৫৭ সালে প্রথম ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সূত্রপাত ঘটে।

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সূতিকাগারও ছিল এই বাংলা। বাংলার মাটিতেই ব্রিটিশ ভাইসরয়ের দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রথম বিক্ষোভ দেখিয়েছেন নবকুমারের মতো মানুষ। বাংলাতেই গড়ে উঠেছে প্রথম জাতীয়তাবাদী পত্রিকা, নীল চাষ নিয়ে সংঘটিত হয়েছে প্রায়োগিক অর্থনৈতিক ও আদর্শগত রাজনৈতিক লড়াই। বাঙালির স্বাধিকার চেতনাকে রুদ্ধ করতেই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকদের গ্রহণ করতে হয়েছে ডিভাইড অ্যান্ড রুল পলিসি। বঙ্গভঙ্গ কিংবা সাম্প্রদায়িকতার যে বিস্তার ব্রিটিশ শাসনযন্ত্র তার শাসন বজায় রাখতে ব্যবহার করেছে, তা কিন্তু বাংলার মানুষের রাজনৈতিক ঐক্যকে বিনষ্ট করার প্রায়োগিক মাধ্যমই বটে।

আপাতদৃষ্টিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদের ইতিহাসে এক প্রহেলিকা। বর্তমানের বাংলাদেশ জনসংখ্যার বিশালতা সত্ত্বেও আনকোরা একটি রাষ্ট্র। প্রাকৃতিক কোনো সুচিহ্নিত ভৌগোলিক সীমানা নয়, বরং বাংলাদেশ হলো দুটি রাজনৈতিক বিভক্তির ফসল। সরলরৈখিক বিবর্তনের ফলে ইংল্যান্ড কিংবা ইতালিতে জাতীয়তাবাদের বিকাশ যেরূপ, বাংলাদেশে কিন্তু তা নয়। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১- এই মাত্র ২৩ বছরের ব্যবধানে এদেশের জাতিসত্ত্বার ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। ১৯৪৭ সালে এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ নিজেকে প্রথমত ধর্মীয় সত্তার মাধ্যমে পরিচিত করে তুলতে গেলেও পরবর্তী সময়ে সাংস্কৃতিক বিচারে একটি ভাষার প্রগাঢ় স্নেহে নিজেকে পুনরাবিষ্কার করেছে। ১৯৭১-এ জন্মের সময় এ রাষ্ট্রটি প্রথমবার ভাষাকে অস্বীকার করে ধর্মের ভিত্তিতে একটি জাতীয়তাবাদের মুখপেক্ষী হয়েছিল এবং মাত্র পাঁচ বছরের মাথায় তাদের আগের ভুল সংশোধন করে মহান ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ক্রমান্বয়ে ধর্মের বন্ধনকে তুচ্ছ করে ভাষার ভিত্তিতে সার্বভোমত্ব ঘোষণা করেছে।

বাঙালির আত্মপরিচয় ঘটেছে মূলত বিশ্বায়নের অভিঘাত থেকে। আবহমানকাল থেকেই সুস্পষ্ট একটি চেতনার সামাজিক বিবর্তন জাতিসত্ত্বার বিকাশে প্রকাশিত। বিংশ শতাব্দীতে জন্মগ্রহণকারী আর দু-দশটা দেশের মতো এদেশে বিভিন্ন অসম জনগোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য নবতর প্রভাবকের প্রয়োজন হয়নি। সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণ আগেই এখানে একটি সফল ভূমিকা পালন করেছে। তাই নিজেদের স্বাধিকার দাবি করার আগেই বাঙালি একটি সুনির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠী ছিল।

প্রাচীনকাল থেকেই দক্ষিণ এশিয়ার ভাষা ও ধর্মের এক অসাধারণ গুরুত্ব স্বীকৃত হয়ে আসছে। বৈদিক আর্য ভাষা থেকে সংস্কৃতে ধর্ম-কর্ম পালন করা যেমন একটি নীরব বিপ্লবের প্রকাশ, ঠিক তেমনি বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ পালি ভাষা ও সংস্কৃতির বাহনেই তার বিস্তার ঘটিয়েছে। ভাষাই এ অঞ্চলে মানুষের ধর্ম ও সামাজিক চেতনাকে নির্দিষ্ট রূপ দিয়েছে। মাতৃভাষার প্রতি অবিমিশ্র আবেগ তাই বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা বড় বাস্তবতা। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনকে পাকিস্তানি সাম্রাজ্যবাদী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম হিসেবে বিবেচনা করা হলেও এটা মনে রাখতে হবে, প্রকৃত অর্থে আমাদের মুখের এই বুলিকে সাত শ’ বছর ধরে লড়াই করতে হয়েছে সংস্কৃত কিংবা আরবির মতো ধর্মীয় ভাষা এবং ইংরেজি ও ফার্সির মতো রাজভাষাগুলোর বিপক্ষে। বাংলার মুসলমান মানসে ধর্ম ও ভাষা নিয়ে সংঘাত চলেছে বিংশ শতাব্দীর প্রথম পর্ব পর্যন্ত। অপরদিকে বাংলার হিন্দু সম্প্রদায় তো ভাষাগত সাম্প্রদায়িকতার শিকার হয়েছে কালজয়ী সাহিত্যিকদের রচনার মাধ্যমেই। ভরতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গলের ভাষ্য আর ফোর্ট উইলিয়াম পরবর্তী লেখকদের রচনার তুলনামূলক পাঠই ভাষিক সাম্প্রদায়িকতার প্রস্ফুটিত উদাহরণ। বাংলা ভাষার অন্যতম ব্যর্থতা হলো প্রতিভাবান লেখকদের হাতে স্থানীয় ভাষার বিকাশের ফলে ধর্মের প্রভাব যেখানে ইউরোপে হ্রাস পেয়েছে, সেখানে বাংলায় রবীন্দ্রনাথের মতো মহীরুহ আপ্রাণ লড়াই করে বাংলা ভাষাকে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প থেকে রক্ষা করতে পারেননি।

পাকিস্তান এ অঞ্চলের মানুষের জন্য ফাঁকিস্তান (সৈয়দ মুজতবা আলীর ভাষায়) হয়ে এসেছে ১৯৪৭ সালে। যদিও জিন্নাহর একরোখামিতে ব্রিটিশদের হিসেবে পাকিস্তান পৃথিবীর মানচিত্রে আবির্ভূত হয়েছিল, তথাপি এটি ছিল মূলত দুইটি দেশ। পাকিস্তানে প্রথম বিরোধ ঘটে ভাষার প্রশ্নে আর পরবর্তীকালে বিরোধ দীর্ঘায়িত হয় পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আধিপত্যবাদের ফলে।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং এ আন্দোলনের গতি রুদ্ধ করার জন্য পাকিস্তানি ও বাংলায় বসবাসকারী উগ্র পাকিস্তানপ্রেমী অবাঙালি রাজনৈতিক নেতাদের দমন-পীড়নের ফলে বাংলায় প্রথমবারের মতো একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ ঘটে। এ বিকাশ ঘটে ভাষার ভিত্তিতে। বাঙালির আপনজন রবীন্দ্রনাথ ছিলেন এ আন্দোলনের মূল ভিত। ষাটের দশকে পূর্ব পাকিস্তানে যে সাংস্কৃতিক বিপ্লব সাধিত হয়, তা কিন্তু কোনো রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের ফসল নয়। বরং বাঙালির চেতনার বিকশিত রূপ মাত্র। ১৫ বছর আগে এ ভূখণ্ডের জনগোষ্ঠী ধর্মের ভিত্তিতে যে দুটি অংশে বিভক্ত হয়েছিল, তার পরিবর্তন ঘটে বাঙালি মুসলমান আর তার ধর্মভিত্তিক পরিচয় নিয়ে। জাতীয়তাবাদের ধ্বজা না ধরে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী রূপ নিয়ে উদীচী, ছায়ানট কিংবা বুলবুল ললিতকলা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে রাজনীতির প্রধানতম ধারা। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশের নেতৃত্ব দেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ ছাত্ররা। পশ্চিমে যেখানে সামরিক তন্ত্রের পরিচর্যা শুরু হয়েছিল, সেখানে পূর্ব বাংলা হয়ে ওঠে শাসনতান্ত্রিক গণতন্ত্রের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। যে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প দক্ষিণ এশীয় জাতিসত্ত্বাগুলোকে কলুষিত করেছিল, বাঙালি জাতি কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয় তার কুপ্রভাব।

বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে এবং রবীন্দ্রনাথের রচনার যে পুনঃপাঠ ও পুনর্মূল্যায়ন এ সময় শুরু হয়, তা বাঙালি জাতির ইতিহাসের জন্য গুরুত্ববহ । বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির জন্মের ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া শুরু হয় এভাবেই। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধও বাঙালির সার্বভৌমত্বের চেতনায় নতুন ডিসকোর্স নিয়ে আসে। এরপর সূচনা হয় বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম অসহযোগ আন্দোলনের। ছাত্র-জনতা নির্বিশেষে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের লক্ষ্যে স্বাধিকারের প্রশ্নে লড়াইয়ে যোগ দেয়। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ফলশ্রুতিতে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের বাঙালির অদ্বিতীয় নেতা হিসেবে প্রকাশিত হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ন্যায্য স্বাধিকার আন্দোলনের গতিরোধ করার জন্য পাকিস্তানি জান্তা শুরু করে সামরিক তাণ্ডব। বারবার সংখ্যাগরিষ্ঠ আওয়ামী লীগকে শাসনতন্ত্র প্রণয়ন ও সরকার গঠনে বাধা প্রদান করে তারা। ১৯৭১ সালের মার্চেই বাংলাদেশ প্রকারান্তরে স্বাধীন হয়ে ওঠে। অর্জন করে সার্বভৌমত্ব। ২৬ মার্চের আগে মূলত ১ মার্চ থেকেই বাঙালি প্রকৃতপক্ষে স্বাধীন এক জাতিতে পরিণত হয়েছিল। গোটা মার্চ মাসে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালি জাতি যা অর্জন করেছিল, তা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ইতিহাসে এক অনন্য নজির। একটি আধুনিক সেনাবাহিনীকে প্রতিরোধের মাধ্যমে বাংলাদেশে উপনিবেশ রাষ্ট্র শাসনের অবসান ঘটিয়ে একটি নতুন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার বীজমন্ত্র বপিত হয় ১৯৭১-এর মার্চেই।

১৯৭১ সালের ৯ মাসের রক্তস্নাত বিপ্লবের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি এক ভাষাভিত্তিক বাস্তবতায় গড়ে তোলে দক্ষিণ এশিয়ার নবীনতম রাষ্ট্র। এ রাষ্ট্রে অধিকার লাভ করে স্বাধীনচেতা মেহনতি মানুষ।

স্বাধিকারের লড়াই থেকেই স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির যে অভ্যুদয় ঘটে, তা পৃথিবীর ইতিহাসে অনন্য। তাই অনেক ব্যর্থতা আর ভুলের পথে চলা সত্ত্বেও বাংলাদেশ অজেয় হয়ে চিরকাল স্থায়ী হবেই।

 

ছবি: মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ

তথ্যসূত্র:

১. বাংলাদেশের অভ্যুদয় : একজন প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য, রেহমান সোবহান

২. অন্ধকারে উৎস হতে, ড. আকবর আলী খান

৩. বাংলাদেশের ইতিহাস (রাজনৈতিক), ড. সিরাজুল ইসলাম সম্পাদিত

৪. বাংলাদেশের তারিখ, মুহম্মদ হাবিবুর রহমান