স্মৃতির রাজত্ব

২০১৫ সালের ৮ আগস্ট। গুলশান অ্যাভিনিউয়ের ‘বেঙ্গল আর্ট লাউঞ্জে’ আয়োজিত হয় শিল্পী বিপাশা হায়াতের একক চিত্রপ্রদর্শনী। প্রদর্শনীর সময় শিল্পীর সঙ্গে আলাপচারিতায় উঠে এসেছিল তার চিত্রকর্ম ও শিল্পী জীবনের নানা দিক। ‘বেঙ্গল বারতার’ পুরোনো সংখ্যা থেকে সেই কথোপকথন আবারও তুলে ধরা হলো পাঠকের জন্য।

 

 

 

 ‘ভ্রমি বিস্ময়ে থেকে স্মৃতির রাজত্ব। সময়ের ব্যবধান চার বছর। যাত্রাটা কেমন কেটেছে?

সুবীরদার (প্রয়াত সুবীর চৌধুরী, ট্রাস্টি, বেঙ্গল ফাউন্ডেশন) আমন্ত্রণে আমি বেঙ্গলের আর্ট ক্যাম্পে অংশ নিয়েছি। ভাবনায় ছিলো শুধু রং আর ক্যানভাস। ২০১১-এর ‘ভ্রমি বিস্ময়ে’র শুরুটা এভাবেই। আমি নিজেকে চিত্রকর্মের মধ্য দিয়ে আবিষ্কার করতে চাচ্ছিলাম। আমি আসলে কী আঁকতে চাই? অভিনয় কিংবা চিত্রনাট্য নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও ছবি আঁকা ছাড়িনি। কিন্তু প্রদর্শনীর জন্য কাজ শুরু করে খেয়াল করলাম, আমি যেখানে ছেড়ে এসেছিলাম সেটা ছিল একটা ভিন্ন মানুষের গল্প। অন্তত আমি একটা নতুন মানুষে বদলে গেছি। একটা রূপান্তর ঘটে গেছে। আর এটাই কিন্তু স্বাভাবিক, প্রতিদিনই আমরা একটা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। চারুকলায় এমএফএ শেষ করার পর আমি তো ১০-১২ বছর সময় নিয়েছি। তারপর আমি কাজ শুরু করলাম পুরোদমে। পৃথিবীতে কী হচ্ছে চেতনার অগম্য ও অদেখা জগতে? যে জগত আমরা দেখতে পাই না সেটাকে যদি আবিষ্কার করি; কাজ করি তাহলে কেমন হয়! আমি তখন সরাসরি রঙে হাত দিলাম, আমি এমন সব রঙ নিয়ে কাজ করছিলাম যা আমি নিজেও কখনো দেখিনি এবং সেগুলো বের করে আনার চেষ্টা করেছি কাজের সময়। আমি অপেক্ষা করি ক্যানভাস আমার মনের অবস্থাটা প্রকাশ করছে কি না সেটার জন্য। প্রথম প্রদর্শনীতে এটাই করার চেষ্টা করেছি। আরেকটা বিষয় হচ্ছে, সে সময় আমি অনেক টেক্সচার বেজড কাজও করেছি। টেক্সচার নিয়ে আমি অনেক ধরনের এক্সপেরিমেন্ট এবারও করেছি।

এই যে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেত্রী থেকে ছবি আঁকার জগতে চিত্রশিল্পী হিসেবে নিজেকে তুলে ধরলেন, এই সংগ্রামটা শিল্পীর অবস্থান থেকে কীভাবে দেখেন?

ধন্যবাদ প্রশ্নটা করার জন্য। এটা আসলেই অনেক বড় একটা সংগ্রাম ছিল, আছে। অনেকে বলেছেও যে, বিপাশার আবার এর মাঝে ঢোকার কী দরকার! কিন্তু পেইন্টিং আমার কাছে সব সময়ই প্যাশন। অসম্ভব ভালোলাগার এই জায়গাটা আমি অনেক কষ্ট করে ধরে রেখেছি। যখন পুরোদস্তুর অভিনয়ে ব্যস্ত ছিলাম তখনো বাসায় মডেল নিয়ে আসতাম, ড্রয়িং করতাম। দেশে কিংবা বিদেশে নতুন কাজ কী হচ্ছে, কী প্রদর্শনী হচ্ছে তার খোঁজ রাখতাম।

আপনার এবারের প্রদর্শনীতে বৌদ্ধ ধর্মের আদর্শ নিয়ে বেশ কয়েকটা কাজ আছে?

বৌদ্ধ ধর্ম আমার বেশ আগ্রহের জায়গা। শুধু বৌদ্ধ ধর্ম নয়, সব ধর্ম নিয়েই আমার অনেক আগ্রহ। ধর্ম ও ধর্মতত্ত্ব ছোটবেলা থেকেই আমার আগ্রহের বিষয়। চীনা দার্শনিক লাউজুর একটা উক্তি আছে, ‘তোমার মন একটা শূন্য পাত্র, এখানে পানি ঢালো, ভরাও।’ আসলে উনি বলেছেন যে, যদি এটা ভরা থাকে তাহলে সেখানে নতুন কিছু আর আসবে না। ড্রয়িংয়ের ক্ষেত্রেও আমার তাই মনে হয়েছে। আমি যদি মনে করি আমি সব ফর্ম শিখে গেছি তাহলে আমার নতুন কোনো আইডিয়া বা ভাবনা আসবে না, নতুন কিছু তৈরি হবে না। এ কারণেই এখন যে বিষয় নিয়ে কাজ করছি, পরের প্রদর্শনীতে আমি অন্য বিষয় নিয়ে কাজ করব।

২০১১ থেকে চারটা একক প্রদর্শনী আপনার।

এছাড়া অসংখ্য যৌথ প্রদর্শনীও করেছি।

আপনি নিজের চিত্রকর্মকে কিভাবে দেখেন?

আমার কাছে ক্যানভাস একটা বড় জায়গা, একান্তই আমার নিজের। এটা টিম ওয়ার্ক নয়। যখন আমি নাটকে অভিনয় করি কিংবা স্ক্রিপ্ট লিখি তখন এটা গ্রুপ ওয়ার্ক। তখন আমাকে অনেকের কথা ভাবতে হয়, মানুষের সাথে কাজ করতে হয়। যখন ক্যানভাসের সামনে যাই তখন সেটা একান্তই আমার ভাবনা। এই যে আমি যখন নাটক লিখি তখনো ভাবি এবার কার কথা মাথায় রাখব, কার গল্পটা লিখব, যাকে আমি চিনি বা যার ঘটনা আমি জানি। বিশেষ করে চরিত্র গঠনের সময় এটা বেশি অনুভূত হয়।

আমি আসলে আমার স্মৃতির রাজ্যে ঘোরাঘুরি করি। আর একটা ছবি কতটা ছবি হয়ে উঠছে তার কিছু ক্রাইটেরিয়া আছে। কিছু কাজ অনেক দ্রুত শেষ হয়, কিছু কাজ ধীরে। আসলে সবই মনের অবস্থা অনুযায়ী। আমিও সেভাবেই কাজ করি। ঐটাই আমার তখনকার মনের অবস্থা। আমার কাজে আমি অনেক সলিড কালার ব্যবহার করি। তবে আগামী প্রদর্শনীর সময়ই এই ফরম্যাট থেকে বেরিয়ে আসতে পারি। আমার এবারের কাজে অনেক ব্রোকেন ফর্ম আছে। আমি ছোটবেলায় বেশ ক’বছর লিবিয়ায় ছিলাম। সেখানে রোমান সভ্যতার প্রচুর নিদর্শন। প্রাচীন সময়কে ধরে রেখেছে। আমার কাজগুলো সেই সময়ের অভিজ্ঞতা দ্বারা প্রভাবিত। আমি ছবিতে আমার ভাষায় বলার চেষ্টা করেছি সেসব সভ্যতার কথা। সেই নিদর্শনগুলো আমার মনোজগতে এত গভীর প্রভাব রেখেছে যে ক্যানভাসে সেই অনুভূতিগুলোই ভাষা পেয়েছে।

কাজের ক্ষেত্রে নিজের মনোজগতটাই আমার কাছে সবথেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যখন অভিনয় করতাম, তখনো আমি চিত্রনাট্য আমার মনের ভিতর নিয়ে নিতে চেষ্টা করতাম, অনুভব করার চেষ্টা করতাম। এভাবেই আমি ছবি আঁকার সময়ও নিজের ভেতরেই আছি। আরেকটি বিষয়কে আমি প্রাধান্য দেই, সেটা হলো আমার স্মৃতি। আমি সব সময় চেয়েছি আমার কাজটা আমার মতোই হোক, আমার কাজ শুধু আমার মনের অবস্থাই প্রকাশ করুক, অন্য কাউকে নয়। আমি আমার প্রত্যেকটা চিত্রকর্মকে পাওয়ার হাউজ মনে করি যেখানে মূলশক্তির উৎস আমার স্মৃতি। কাজ করার সময় আমি কিন্তু টেক্সচারের পেছনে ছুটি না।

এ কারণেই আমি বারবার নিজেকে ভাঙতে চাই, নিজের সাথে বোঝাপড়ার জন্যই। আমি আসলে অনেক ফর্ম নিয়ে কাজ করতে পছন্দ করি। এবারের প্রদর্শনীতেও কিন্তু প্রচুর ফর্ম নিয়ে কাজ আছে। আর আমার বিমূর্ত ধারার কাজের মধ্যে আর্টকে নিজের মতো উপস্থাপন করার একটা চেষ্টা আছে। অনেকে ভাবে যে, এটা আমার কাজের ধরন, আমি এভাবেই কাজ করে যাব। আমি কিন্তু এটা বিশ্বাস করি না।