হিজল গাছের তলে

চারদিকে অথৈ পানি, মাঝখানে প্রকাণ্ড এক হিজল গাছ দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে গাঁয়ের লোকেরা একে দেখে তৃপ্তি অনুভব করে। গ্রামটা সুন্দর আর পরিপাটি। গ্রামের নামটাও মনোহর- লালুয়ামাঝিরা। গ্রামের পশ্চিম দিকে হিজল গাছটা। ছায়াটা অনেক বিস্তৃত, পাখিদের মিলনমেলা আর জনমানুষের আনাগোনা। এমন হিজল গাছ কিন্তু আরো দুটো আছে, যেখান থেকে চলনবিলের প্রবাহ সোজা চলে গেছে। অনেকদিন থেকে গ্রামবাসী মনে করে যে, এই বহুবর্ষী হিজল গাছগুলো তাদের গ্রামগুলোকে আগলে রেখেছে, আর আশ্রয় দিয়েছে তার মানুষকে।

নৌকা থেকে ওই দূরে দেখা যাচ্ছে গ্রামগুলোকে, যেন ঠিক জল রঙ্গে আঁকা। চলন বিলের আশপাশজুড়ে রয়েছে এমন হাজারো গ্রাম। বর্ষায় মাছের ছোটাছুটি বেড়ে যায় অনেক গুণ। পানির ছলাৎ ছলাৎ শব্দে মনটা নেচে ওঠে। আমরাও সেই আনন্দ খুঁজতে বেরিয়ে পড়ি সদলবলে চলনবিলের বিশালত্তে। বিটিইএফ (বাংলাদেশ ট্যুরিজম এক্সপানশন ফোরাম)-এর অফিসে দলনেতা লিস্ট বের করতেই দেখি সব মিলিয়ে ১০-১২ জন হয়ে গেছে। বিলে ঘুরতে আমরা গিয়ে হাজির হলাম পাবনার চাটমোহরে।

সূর্য ওঠার বেশ আগেই আমরা শাহজাদপুর পরিবহনে এসে নামলাম চাটমোহরে। আলো ফোটার অপেক্ষায় রইলাম। সকালের নাস্তা সেরে আমরা চাটমোহরের পুরাতন বাজার থেকে নসিমনে রওনা দিলাম ধানকুনিয়া গ্রামের দিকে। সেখান থেকেই আমরা নৌকাতে উঠব। ধানকুনিয়া গ্রাম একসময় নদীবন্দর ছিল, হাট বসতো, লোকে দূর-দূরান্ত থেকে তাদের নৌকায় করে সদাইপাতি নিয়ে আসতো হাটবারের দিনে। এখন বন্দর নেই কিন্তু এখন হাট বসে সপ্তাহে দুই দিন। ইঞ্জিন নৌকাটা বেশ বড়সড়, ২০-২৫ জন সহজেই চলে যাবে। আর আমরা তো মাঝিমাল্লা নিয়ে মাত্র ১৩ জন। এক পাশে বাঁশের ছাউনি দেয়া, আর বৃষ্টি থেকে বাঁচার প্রস্তুতি আমাদের কাছেই আছে। চলনবিলের দক্ষিণ প্রান্ত থেকে আমরা মূলত যাত্রা শুরু করলাম বোয়ালমারি গ্রাম হয়ে বরাল নদীতে, তারপর খোটষাগাড়ির বিল, দুর্গাদেবীপুর গ্রাম, কামআসন, লালুয়ামাঝিরা, কুন্দইল, মাগুরা, দিঘিসগিনা গ্রামসহ অনেক গ্রাম পার হলাম। তাপের মাত্রা বেড়েই চলেছে, আমাদের মনও উদগ্রীব পানিতে নামার জন্য। বিলের একটা সুন্দর জায়গায় আমরা নৌকা থামালাম। তারপর জলকেলি যে যতক্ষণ ইচ্ছা। পানির মাত্রা তুলনামূলক কম, ঠাঁই পাওয়া যায়। তবে তা সব জায়গাতে নয়। চলনবিলের প্রধান অংশ মূলত সিংড়া উপজেলার দিকে। এ অঞ্চলের বিলের পানি অনেক গভীর।

তবে সবচেয়ে ভয়ের কথা হচ্ছে চলনবিলে এখন পানির পরিমাণ দিন দিন কমে যাচ্ছে প্রচুর পরিমাণে পলি জমার কারণে। চারপাশে অনেক বসতি বাড়ছে, ইরি শস্যের ফলন বেড়েই চলেছে। ফলে বিলের পানিপ্রবাহেও ব্যাঘাত ঘটছে। বিশাল এই চলনবিলকে বাংলাদেশের বৃহত্তম বিল বলা হয়। বর্ষায় এ বিলের পরিধি হয় ৩৬৮ বর্গকিলোমিটার। মূলত ব্রক্ষপুত্র নদ যখন তার প্রবাহপথ পরিবর্তন করে বর্তমান যমুনায় রূপ নেয়, সে সময়ই চলনবিলের সৃষ্টি। আর এই বিলকে কেন্দ্র করে এখানকার অনেক গ্রামেরও নানা নামকরণ করা হয়েছে। গুরুদাসপুরে বিল থেকে বিলশা গ্রামের নাম হয়। চলনবিলের আশপাশে প্রায় ১৫০০টি গ্রাম রয়েছে। আমরা নৌকা নিয়ে এর কত গ্রাম পেরিয়েছি হিসাব রাখা মুশকিল। আর এত সুন্দর এর প্রকৃতি ও চারপাশ। মনটা ভরে যায় এমন সুন্দর আর শ্যামল গ্রামবাংলা দেখলে। মানুষগুলো কেমন সহজ সরল, তাদের জীবিকার অনেকটা অংশজুড়ে রয়েছে এই চলনবিল। কেউ নৌকা বায়, কেউ মাছ ধরে, কেউ বা এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে, গাঁয়ের বধূদের নিয়ে যায়। অনেকদিন পর পালতোলা নৌকা দেখলাম, বাতাসের দোলায় ছুটে চলে এসব নানা রঙের পাল, চোখ জুড়ানো। আবার নৌকায় ঘর সমান খড় বোঝাই করেও নিয়ে যাচ্ছে। আমরা ঘুরতে ঘুরতে নওগাঁতে প্রবেশ করলাম।চাঁচকৈড় উপজেলার গুরুদাসপুর থানায় এসে আমাদের নৌকা থামল। এই গুরুদাশপুরে চলনবিলের ওপর একমাত্র একটা জাদুঘর আছে।

একটা দ্বীপের মতো জায়গায় এসে নৌকাটা ভেড়ালাম। ইঞ্জিনের শব্দে কান ঝালাপালা হয়ে গেছে। এখন নিস্তব্ধ, শুধু হু হু বাতাস আর পানির ছলাৎ শব্দ। আকাশে কালো মেঘ জমেছিল, ওই দূর দিয়ে পালতোলা নৌকা চলে যাচ্ছে আর আমরা ছোট্ট একটা দ্বীপে। ভাবাই যায় না, দৃশ্যটা একেবারে ছবির মতো। সন্ধ্যা নামতেই বিশাল এই বিলের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলাম। এখানে সেখানে জ্যোৎস্নায় চিকচিক করছে। গ্রামগুলোকে অন্যকিছু মনে হচ্ছে, একদম অচেনা। বিলের এ রূপ দিনের বেলার চেয়ে একেবারে অন্যরকম। যেন এ এক মায়ানদী। দিনের বেলা ভটভটির শব্দে কিছুই শুনতে পাইনি। এখন শুনতে পাচ্ছি কলকল ধ্বনি। পানির মধ্যে যেন চাপা আলো জ্বলছে। একেকবার মনে হচ্ছে পানি কোথাও সরে যাচ্ছে। হঠাৎ মনে হলো, এই বিলে বোধহয় রাত-দুপুরে পরি নামে। আমি ভূতে বিশ্বাস করি না বটে, তবে পরি বা অপ্সরিদের সম্পর্কে কিছুটা বিশ্বাস আছে। হঠাৎ তাদের কারো সঙ্গে দেখা হয়ে যেতে পারে বলে আশা করে বসে আছি। শুনেছি এসব সুন্দর জায়গায় নাকি পরিরা নেমে আসে। রুপালি রাজ্যে ভাসতে ভাসতে আমাদের নৌকা এসে ভিড়েছে তাড়াশের পাঁচ মাইল পশ্চিমে কুন্দইল গ্রামে। গ্রামটা ছোট, তবে দেখার আছে অনেক কিছু। ভাবনাতে বাগড়া দিলো গনি ভাই খিচুড়ি রান্নার তাগিদ দিয়ে।

ভোরটা তো আরো সুন্দর। পাখিদের ডাকাডাকি, বিস্তীর্ণ গ্রাম আর অথৈ জ্বলরাশি। নৌকা তাড়াসের আমকুড়িয়া গ্রামে এসে থামল। সেখানে সকালের নাস্তা হলো। এটি তাড়াসের একটি বাঁধ, কেউ চাইলে এই বাঁধ থেকেও নৌকা ভাড়া করে বিলে ঘুরতে পারে। আমরা আরো কিছুদূর গিয়ে আরেকটা দ্বীপের মতো জায়গা পেলাম আর নেমে গেলাম। বিলের মাঝে এমন অনেক ছোট ছোট উঁচু জায়গা আছে, যা এখনো পানিতে ডোবেনি তা দ্বীপের মতোই মনে হবে। আমাদের ফেরত যাবার সময় হলো। স্মৃতিগুলো বয়ে নিয়ে যাচ্ছি কংক্রিটের শহরে, সযতনে রেখে দেবো। এসব মোহনীয় স্মৃতিই তো অনেক ভালো থাকার প্রেরণা জোগাবে। মার্কিন ভ্রমণ লেখক পল থেরো বলেছেন, ভ্রমণ মোহনীয় লাগে, যখন পেছন ফিরে তাকাই।

 

ছবি: লেখক